শিলাবৃষ্টি ও কাল বৈশাখীর হানা : বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ মার্চ ২০২৬, ৭:৫৯:১৪ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে শিলাবৃষ্টি ও কাল বৈশাখী ঝড় হানা দিয়েছে। চৈত্রের এমন সময়ে ধান গাছে যখন থোড় বের হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহুর্তে কাল বৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির আঘাত কৃষকদের শঙ্কায় ফেলেছে। চলতি মৌসুমের প্রথম কাল বৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি গত বৃহস্পতিবার সিলেট ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে। গত শনিবার (১৪ মার্চ) ও গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে কাল বৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত ছিল। ফলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বোরো মৌসুমে দীর্ঘ খরার কারণে বোরো ধানের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। দেরিতে হলেও ফাল্গুনের শেষ দিনে বৃষ্টি হলে আশার আলো জাগে কৃষকদের মাঝে। কিন্তু চৈত্র মাসের প্রথম দুদিন টানা কাল বৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কৃষকদের সেই আশা এখন ফিকে হয়ে গেছে।
সুনমাগঞ্জের হাওরপারের কৃষকরা বলছেন, বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যখন সবুজ ধানগাছগুলো উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই কাল বৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের গাছ হেলে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, সিলেট নগরী ও আশপাশের এলাকায় শনিবার (১৪ মার্চ) রাত থেকে রোববার (১৫ মার্চ) সকাল পর্যন্ত ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে ভারী বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। প্রবল আবহাওয়ার কারণে অনেক বাসাবাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছে, কোথাও কোথাও গাছ ভেঙে পড়েছে। ফলে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ৭১ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। রোববার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আরও ১২ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ রুদ্র তালুকদার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, উড়ে যাওয়া টিনের কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়েছে। টিন উড়ে যাওয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে গেছে ঘরের সকল আসবাবপত্র। তাছাড়া কিছু এলাকায় ভেঙে পড়া গাছ রাস্তা ও বিদ্যুতের লাইনের উপরে পড়েছে। এতে করে ওই সব স্থানে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগে ব্যাঘাত ঘটেছে। তাছাড়া বৃষ্টির ফলে নগরীর কয়েকটি স্থানে জলাবদ্ধতার খবরও পাওয়া গেছে।
সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়ির টিনের চাল উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কানাইঘাট উপজেলার ১নং লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের বাউরভাগ দ্বিতীয় খন্ড এলাকায় ঝড়ের কারণে ঘরের টিন উড়ে যাওয়ায় একটি শিশু আতঙ্কিত হয়ে কান্না করছে এবং দিগবিদিক ছুটোছুটি করছে। তাছাড়া সিলেট নগরীর চৌকিদেখি এলাকায় বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারের পাশে একটি গাছ ভেঙে ইন্টারনেট লাইনের উপর পড়ে। এতে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগে বিভ্রাট দেখা দেয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেটসহ দেশের আটটি বিভাগে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময়ে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। বিশেষ করে সিলেট, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় দমকা-ঝড়ো হাওয়া, বিদ্যুৎচমকানো বৃষ্টি এবং শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে রয়েছে। ঢাকায় বাতাস পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিমি বেগে প্রবাহিত হচ্ছে, অস্থায়ীভাবে তা ৪০ থেকে ৫০ কিমি বেগে দমকা বইতে পারে। গতকাল শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ঈশ্বরদীতে ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আজ সিলেটে রেকর্ড করা হয়েছে ১৫ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সুনামগঞ্জে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি, ফসল নিয়ে শঙ্কায় হাওরের কৃষক : সুনামগঞ্জে গত দুই দিন ধরে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে হাওরপারের কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও শঙ্কা। বিশেষ করে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। শনিবার (১৪ মার্চ) রাত ও রোববার(১৫ মার্চ) সকালের দিকে জেলার দিরাই,শাল্লা,জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় হঠাৎ করেই ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। কয়েক মিনিটের তীব্র শিলাবৃষ্টিতে অনেক জায়গায় ধানক্ষেতের গাছ নুয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩৭ হাওরে প্রায় ১০ লাখ কৃষক দুই লাখ ২৩ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করেছেন। আর মাসখানেক পরই কষ্টের ফলানো এই ধান গোলায় তোলার কথা কৃষকদের। এর মধ্যেই সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত ও বিভিন্ন উপজেলায় শিলাবৃষ্টি শুরু হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
হাওরপারের অনেক কৃষক নিজেদের জমিতে গিয়ে ধানের অবস্থা দেখছেন। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, শিলাবৃষ্টি বাড়লে ধানের শিষ ভেঙে যেতে পারে এবং গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পারে। দিরাই উপজেলার মাইট্টাপুর গ্রামের কৃষক মুতালিব উল্লা জানান, সারা বছর আমরা এই বোরো ধানের অপেক্ষায় থাকি। অনেক কষ্ট করে চাষ করেছি। এখন যদি শিলাবৃষ্টি বেশি হয়, তাহলে বড় অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কালিপুর গ্রামের কৃষক শফিক আহমেদ জানান, ধানের শিষ আসতে শুরু করেছে মাত্র এই সময় ঝড় বা শিলাবৃষ্টি হলে ধান মাটিতে পড়ে যায়। তখন ফলন অনেক কমে যাবে। তাই খুব দুশ্চিন্তায় আছি। জামালগঞ্জ উপজেলার বড় ঘাগটিয়া গ্রামের কৃষক লতিফ মিয়া জানান, নিজের কোন জমি নাই,অন্যের জমিতে আবাদ করেছি। গত রাত ও আজকে সকালে এই দুইদিনে যে পরিমাণ শিলা বৃষ্টি হয়েছে এবার ধান কতটুকু হবে তা নিয়ে চিন্তায় আছি।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, জেলার পাঁচটি উপজেলায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ধানের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিলাবৃষ্টি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ধানের ক্ষতি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের ন্যায় গত শুক্রবার মৌলভীবাজার জেলায়ও কাল বৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি হয়েছে। ওই দিন জেলায় ৩৬.৩ মিলিমিটার বৃষ্টপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার ও রোববারও জেলাজুড়ে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে শঙ্কায় রয়েছেন দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি হাওর পারের কৃষকরা।




