ভুমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ যুবকের লাশ : ইউরোপে স্বপ্নযাত্রার নির্মম সমাধি
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৯:৩৭ অপরাহ্ন
খাবারের অভাবেই তাদের প্রাণহানী

স্টাফ রিপোর্টার : উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ২২ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত যুবকদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশী রয়েছেন। তন্মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ যুবকের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে। তীব্র খাবার ও পানি সংকটে তারা প্রাণ হারিয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ চান জনসাধারণ। একই সাথে বৈধপথে ইউরোপ যাত্রার বিষয়টি সহজলভ্য করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান তারা।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, তাঁরা এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। এরমধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন আছেন।
যেসব দালালের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া।
জানা গেছে, গত ৬ মার্চ নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছান হবিগঞ্জের এক যুবক। তাঁকে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। ২৭ মার্চ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদেরও একই ক্যাম্পে রেখেছে দেশটির কোস্টগার্ড। শনিবার রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যম তাঁর সঙ্গে কথা বলে। এসময় তিনি বলেন, মূলত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণেই ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা যান। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছিল ছয় দিন। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।
ওই যুবক বলেন, শনিবার তিনি ক্যাম্পে আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা সুস্থ আছেন। ওই যুবক বলেন, বোটটি পথ হারিয়ে ফেলে। ছয় দিন সাগরে ছিল। এ সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে অনেকে মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সুনামগঞ্জের। তবে মৃত মানুষের সঠিক সংখ্যা তাঁদের জানাতে পারেননি আহত ব্যক্তিরা। মৃত ব্যক্তিদের দুই দিন বোটে রেখে পরে তাঁদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সীমিত খাবার নিয়ে ছোট ছোট বোটে করে লোকজনকে লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠানো হয়।
জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে জেলায় ১০ জনের তথ্য পাওয়া গেলেও সর্বশেষ দিরাই উপজেলার আরও দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। এর মধ্যে দিরাই উপজেলায় ৬ জন, দোয়ারাবাজারে ১ জন এবং জগন্নাথপুর উপজেলায় ৫ জন রয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া জীবিতদের বরাতে জানা যায়, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় তীব্র খাবার ও পানির সংকটে একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ, পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন- দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহান, দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, দিরাই উপজেলার এক মানবপাচারকারীর সঙ্গে জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে তারা লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। চুক্তি অনুযায়ী বড় ও নিরাপদ নৌযানে নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া হয়, যা এই মর্মান্তিক ঘটনার অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। স্থানীয়রা দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে জড়িত মানবপাচার চক্রকে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তারা।
মাটিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল চৌধুরী বলেন, লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তায়েফ আর আমাদের মাঝে নেই—এই খবরটা খুব কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
সুনামগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার জানান, জেলার তিন উপজেলার একাধিক মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, আমরা স্থানীয় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারছি। কিন্তু তারা যেহেতু বৈধপথে কোন এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছিলেন না, তাই তাদের বিষয়ে সরকারি কোন তথ্য নেই। এরপরও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করে পরবর্তী করনীয় নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি যেন ভুক্তভোগী পরিবারদের খুঁজে বের করে এ সম্পর্কিত সকল তথ্য নথিভুক্ত করেন। এটি করার পর যারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অবৈধপথে পাচার করছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।





