উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হাম : রোববার থেকে জরুরী টিকাদান
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ৩:৫৭:৫০ অপরাহ্ন
গতকাল পর্যন্ত ৪১ শিশুর মৃত্যু,
সিলেটে ভর্তি আরো ২১ জন
জালালাবাদ রিপোর্ট: সিলেটসহ বেশ কিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি করা হচ্ছে হাম আক্রান্তদের। হামের সংক্রমণের ফলে আক্রান্ত শিশুদের অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে। গতকাল পর্যন্ত দেশে ৪১ শিশু মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সর্বত্র।
দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুরা এই রোগের টিকা পাওয়ার পরেও কেন এই সময় আবার রোগটির প্রবণতা বাড়ছে, সেই আলোচনা জোরদার হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পরেও অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের। কারণ ব্যাপক ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত এই রোগটি আক্রান্ত শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
তবে সরকার বলছে, এই পরিস্থিতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বরং এটি গত কয়েক বছরের নীতি-ঘাটতি, বিলম্বিত সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল বাস্তবায়নের একটি ফলাফল। বিশেষ করে টিকা সংগ্রহে ধীর গতি, সময়মতো ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন না করা, এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং পরিস্থিতির জরুরিতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থতা-এই সংকট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এ অবস্থায় আগামী রোববার থেকে হামের জরুরী টিকাদান (ইমারজেন্সি ভ্যাকসিনেশন) কার্যক্রম শুরু করছে সরকার। দেশের যেসব উপজেলায় শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, প্রথমে ওই সব উপজেলা থেকে এই টিকা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বুধবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই ঘোষণা দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে আজ এবং কালকের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বিশেষভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত (হামে) উপজেলায় আগামী দুই দিনের ভেতরে ভ্যাকসিন এবং সিরিঞ্জ গ্রাম অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আর রোববার সকাল থেকে টিকাদান শুরু করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা ইমারজেন্সি ভ্যাকসিনেশন কাজ আগামী রবিবার থেকে শুরু করব। আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সমস্ত ছুটি আগামীকাল (আজ) থেকে প্রত্যাহার করে নিলাম। কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে তারা সকলে আন্ডার সুপারভিশন অফ লোকাল অফিসার থাকবে এবং কাজ করবে।
এর আগে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ছয়শো কোটি টাকা নতুন করে টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে রোববার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
কেন বাড়ছে হামের রোগী :
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ও শিশু চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুক দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ঔষধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া হামের জন্য যে টিকা দেওয়া হচ্ছে সেই টিকার মান এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকা দেওয়ার কারণে ভাইরাসের ধরণে কোনো পরিবর্তন নতুন করে হামের প্রকোপে ভূমিকা রেখেছে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে।
ময়মনসিংহে আরও দুটি শিশুর হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় হাসপাতালগুলোয় হাম সন্দেহে ভর্তির ভিড় বাড়ছে। মার্চ মাস জুড়ে এখন পর্যন্ত সারাদেশে হামের কারণে অন্তত ৪১টি শিশুর মৃত্যুর তথ্য এসেছে দেশের সংবাদ মাধ্যমে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সাধারণত ৯ মাস পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায় শিশুরা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে যারা আক্রান্ত তাদের ৩৩ ভাগ এই বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সীদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বাড়ছে।
তিনি জানান, সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৯-১৫ বয়সী শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও এর অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর হামের টিকা দেওয়ার যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়, ২০২৪ সালে তা হয়নি। ২০২০ সালে করোনা, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে হামের টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি এবং এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি।
চলতি বছরের শুরু থেকেই এই রোগটির প্রকোপের সম্ভাবনা প্রকাশ পাচ্ছিল। বিশেষ করে জানুয়ারির শুরুতে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঢাকার কিছু বস্তিতে রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছিল।
এরপর চলতি মাসেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ সুবিধার অভাবে ৩৩টি শিশুর মৃত্যুর খবর দেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। যদিও এদের ১০ থেকে ১২টি শিশু হামে আক্রান্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকার শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলেছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি কারণ রোগটিতে আক্রান্ত হলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং সে কারণে নিউমোনিয়ায় ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।
এদিকে জনপ্রিয় আলেম ও আলোচক আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেছেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মিছিল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সংকট আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাতের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
সিলেটে আরো ২১ জন ভর্তি :
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও ২১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে বুধবার এ তথ্য জানানো হয়েছে। এরমধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন সদর হাসপাতারে ৬জন, রাগীব রাবেয়া হাসপাতাল, মাউন্ড এডোরা হাসপাতাল ও বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন করে মোট ৩ জন, জৈন্তাপুর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন করে মোট ৪ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
সব মিলিয়ে সিলেট বিভাগে বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৪৩ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী ভর্তি রয়েছেন। উল্লেখ্য যে, সিলেটে হাম শনাক্তের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হামের লক্ষণ নিয়ে যারা ভর্তি হন তাদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার মহাখালী থেকে নমুনার ফলাফল পাওয়ার পর চূড়ান্ত হাম রোগীর সংখ্যা জানা যায়।




