হবিগঞ্জে তেলবাহী ওয়াগন লাইনচ্যুত, তেল লুটের মহোৎসব
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৩৬:৩৩ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা-সিলেট রেলপথের হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলায় ভয়াবহ দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী তেলবাহী একটি ওয়াগন। ৩৯ হাজার লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে বুধবার (১ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে মনতলা রেলস্টেশনের অদূরে একটি ব্রিজের কাছে দুর্ঘটনার কবলে ট্রেনটি। ৬টি ওয়েল ট্যাংকার লাইনচ্যুত হয়ে পড়ার ঘটনায় প্রায় ১৬-১৮ হাজার লিটার তেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রেলওয়ে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। অতিরিক্ত গতির কারণে ট্রেনের অয়েল ট্যাংকার ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনায় সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ ১৯ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। দীর্ঘ সময় পর বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উদ্ধার কাজ সমাপ্ত হলে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। এই সময়ে সিলেট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী ৩টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে আরও কয়েকটি ট্রেন। এতে সিলেট-ঢাকা ও সিলেট চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা ভয়াবহ দূর্ভোগে পড়েন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, মনতলায় সিলেটগামী ৯৫১ নম্বর তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি অয়েল ট্যাংকার ওয়াগনসহ ৬টি বগি লাইনচ্যুত হয়। বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মনতলা রেলস্টেশনের অদূরে একটি ব্রিজের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। লাইনচ্যুত ৬টি বগির মধ্যে একটি রেললাইনের পাশের খালে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর দুটি ওয়াগন থেকে তেল বের হতে শুরু করলে স্থানীয়রা তা সংগ্রহ করতে থাকেন। এতে ঘটনাস্থলে ভিড়ের সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে বুধবার রাত সোয়া ২টায় আখাউড়া থেকে একটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। রেলওয়ের পাশাপাশি বিজিবি, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। বুধবার রাত এবং বৃহস্পতিবার দিনভর উদ্ধার কাজ চালিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটি উদ্ধার করে। দীর্ঘ উদ্ধার কাজ শেষ বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে। দূর্ঘটনার ফলে সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ ১৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, উদ্ধার কাজ শেষে পর্যায়ক্রমে ট্রেন চলাচল শুরু করা হয়েছে। প্রথমে হরষপুর স্টেশনে অবস্থানরত সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস চালু করা হয়। এরপর শায়েস্তাগঞ্জে থাকা কালনী এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস শ্রীমঙ্গল স্টেশনে অবস্থান করছিল। অন্যদিকে সিলেটগামী আরেকটি পাহাড়িকা এক্সপ্রেস আজমপুর স্টেশনে অবস্থান করছিল।
অপরদিকে রাতে চুরি হওয়া তেল বিভিন্ন বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে বিজিবি। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন থেকে ১ হাজার লিটার ডিজেল (জ্বালানি তেল) উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও হবিগঞ্জ ৫৫ বিজিবি এসব তেল উদ্ধার করে।
স্থানীয়দের দাবি, পুরনো ও জরাজীর্ণ স্লিপার, লাইনের নিচে পর্যাপ্ত মাটি ও পাথরের অভাব এবং সিঙ্গেল লাইনের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের আশঙ্কা, যাত্রীবাহী ট্রেন হলে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত। দুর্ঘটনার পেছনে ওভার স্পিডসহ নানা কারণ থাকতে পারে।
একটি ক্রেন উদ্ধার কাজ চালিয়ে তেলবাহী ট্রেনটি উদ্ধার করেছে উল্লেখ করে ঢাকার বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার এবিএম কামরুজ্জামান জানান, বিভাগীয় পরিবহণ কর্মকর্তাকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা টেকনিক্যাল সমস্যা, ওভার স্পিড কি না, সব কিছুই আমাদের তদন্তের মধ্যে থাকবে। এখনও পর্যন্ত ৩টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ১টি হচ্ছে সিলেট থেকে ঢাকা, ১টি সিলেট থেকে চট্টগ্রাম এবং ১টি চট্টগ্রাম থেকে সিলেট। ট্রেনটির ধারণ ক্ষমতা ৩৯ হাজার লিটার তেল। তবে আমরা নিশ্চিত নই কতটুকু নষ্ট হয়েছে। আমাদের ধারণা ২টি ওয়াগন পুরোপুরি ঠিক আছে। ১টি ৯০ শতাংশ ঠিক আছে। অন্য দুটিতে ৭০ শতাংশ তেল ঠিক আছে। ক্ষয়ক্ষতি আপাতত নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। সেটি তদন্ত কমিটি ঠিক করবে।
হবিগঞ্জ ৫৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল তানজিলুর রহমান জানান, সেনাবাহিনী ও বিজিবির উদ্ধারকারী দল নিজস্ব উদ্যোগে ড্রাম ও জারকিন সংগ্রহ করে প্রায় ১ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করে সংরক্ষণ করেছে। এ উদ্যোগের ফলে সরকারি সম্পদের অপচয় রোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনাস্থলে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখাও সম্ভব হয়েছে।





