সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় ডুবছে ফসল
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩২:৪৫ অপরাহ্ন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। বিস্তীর্ণ মাঠে দুলছে বোরো ধানের শীষ। দেখলে মনে হবে স্বপ্নে মোড়া এক সবুজ সমুদ্র। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কৃষকের গভীর দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা। সেই দুশ্চিন্তা এখন জলাবদ্ধতা ও শিলাবৃষ্টি।
সরেজমিনে দেখার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, এই হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে। হাওরে বুক সমান পানি। ধানের থোর ডুবে পঁচন ধরে গন্ধ বের হচ্ছে। কৃষকেরা ফসলের মাঠে দাঁড়িয়ে শুধুই কাঁদছেন। এই হাওরে স্লুইসগেট দিয়ে পানি গেলেও উথারিয়া বাঁধের কারণে পানি আটকে জলাবদ্ধতায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এ হাওরে পানি নিস্কাশন করতে হলে উথারিয়া বাঁধ কেটে দিতে হবে। তবেই রক্ষা পেতে পারে অবশিষ্ট জমির ফসল। অনেকেই ভিন্ন মত পোষন করে বলছেন উথারিয়া বাঁধ কেটে দিলে মহাসিং নদীর পানি এসে হাওর ডুবিয়ে দেবে। এ হাওরের বাঁধে স্লুইসগেট না হলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব না।
মধ্যনগর উপজেলার টগার হাওরে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে অর্ধেকেরও বেশি জমি। ধান পানির নীচে থাকায় পঁচন ধরেছে। চোখের সামনে ফসল ডুবতে দেখে কৃষকরা নির্বাক দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন। চন্দ্রসোনার তাল, সোনামড়ল, ধানকুনিয়া, রুইবিল, গুরমাসহ বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে, সদর উপজেলার জোয়ালভাঙা হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় কৃষকেরা ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে পানি নিস্কাশন করছেন। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বাঁধ কাটা না হলে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যেতো সোনালী ফসল। একইভাবে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কলকতা ও হুগলির হাওরে। শত শত একর জমি জলাবদ্ধতায় ডুবে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। শনির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাবদ্ধতায় আধা পাকা ধান ডুবতে শুরু করেছে।
ইসলামপুর গ্রামের কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, আমি ১০ কেদার বোরো জমি রোপণ করেছিলাম। জমি রোপণ করতে খরচ হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পুরো জমি তলিয়ে গেছে। ধানে পঁচন ধরেছে। এক মুঠো ধান তুলতে পারব না। কি করে সংসার চালাবো জানিনা।
কৃষক তৈয়বুর রহমান জানান, আগে দেশি জাতের ধান আবাদ হতো। ধানের চারা লম্বা হতে। জলাবদ্ধতা হলেও ফসল ডুবতনা। এখন হাইব্রিড ধান নিচু হয়। জলাবদ্ধতার পানিতে সহজে ডুবে যায়। হাওরে ফসল বাঁচাতে হলে দেশি জাতীয় ধানের ফলন ফিরিয়ে আনতে হবে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, হাওরে জলাবদ্ধতা একটি স্থায়ী সমস্যা। এটি দুর করতে নতুন পরিকল্পনা করতে হবে। হাওরে স্লুইস গেইট ও হাওরে খাল খনন করে পানি বের করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাঁধের কারণে যেখানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে সেখানে বাঁধ কেটে পানি নিস্কাশন হচ্ছে বলে তারা জানান।
কৃষকদের অভিযোগ, হাওর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রতিবছর বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকলেও অনেক স্থানে বাঁধ এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। এতে করে পানি ঢুকে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে জেলায় এক হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি ডুবে গেছে। তবে কৃষকদের সতর্ক থাকতে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কৃষি বিভাগ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কৃষক, জনপ্রতিনিধি নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছি। সভায় হাওর, নদী, খাল ভরাট হয়ে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আগামিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সরকারকে জানিয়েছি। এছাড়া যেখানে ফসলরক্ষা বাঁধ কেটে পানি নিস্কাশন করতে হবে সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পরামর্শ নিয়ে বাঁধ কাটা হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।




