৩৬তম দিনেও পাল্টাপাল্টি হামলা : দুই যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের পর তেহরানে উল্লাস
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ৯:২৪:২২ অপরাহ্ন
ট্রাম্পের ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ ইরানের
জালালাবাদ রিপোর্ট : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার গতকাল ৪ এপ্রিল ছিলো ৩৬তম দিন। কালও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিলো। হামলার প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে ইরান। দেশটি ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরেও হামলা হচ্ছে। এতে সংঘাত ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধে ইরানের অন্তত ৩০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ‘সরাসরি হামলার’ শিকার হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইরান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি’র (আইএসএনএ) বরাতে দেশটির বিজ্ঞান মন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইরানের বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হোসেন সিমায়েই সাররাফ বলেন, ‘অসামরিক এলাকা এবং শিক্ষা ও গবেষণার জন্য জরুরি অবকাঠামোসমূহকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।’ আইএসএনএ-র প্রতিবেদনে মন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে আরও বলা হয়, ‘আজ লাখ লাখ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষা ও গবেষণা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গতকাল তেহরানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘শহীদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটি’র বেশ কিছু ভবন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান সরকারের দাবি, দেশটির বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ওপর ইরানের ব্যাপক হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গতকাল ইরান থেকে ছোঁড়া ২৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫৬টি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে আমিরাতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোট ৪৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ২৩টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ১৪১টি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
সংঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরে মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের এসব হামলায় এ পর্যন্ত আমিরাতের দুজন সামরিক সদস্য এবং একজন মরক্কান ঠিকাদার প্রাণ হারিয়েছেন।
বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিবৃতিতে জানানো হয়, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ফিলিস্তিন, ভারত ও মিশরের নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৭ জন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ষষ্ঠ সপ্তাহে পা রাখার সাথে সাথে ইরানের শিল্প খাতের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাত কারখানা, সিমেন্ট কারখানা এবং পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সগুলো এখন এই হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) দক্ষিণ ইরানের একাধিক পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে হামলা চালানো হয়। এসব স্থাপনার কোনো কোনোটি দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট।
এদিকে, শুক্রবার ভোরে প্রথম মার্কিন বিমানটি ভূপাতিত করা হয় এবং বর্তমানে এর পাইলটের সন্ধানে তল্লাশি চলছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে এই তল্লাশিতে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ করেছে কর্তৃপক্ষ। অন্য একটি বিমান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে হরমুজ প্রণালীর কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে। ইরানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে ওই ‘এ-১০ ওয়ার্টহগ’ বিমানটিও তারা গুলি করে নামিয়েছে। সেই বিমানের পাইলটদেরও খোঁজা হচ্ছে।
ইরানে বর্তমানে অত্যন্ত আনন্দের সাথে এসব বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি রাতেই রাজপথে উল্লাস দেখা গেছে, তবে আজ রাতের উদযাপনে এক নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। ইরানিরা বলছেন, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন এটি তারই প্রতিফলন। তারা নতুন নতুন চমকের অঙ্গীকার করেছিলেন এবং বলেছিলেন, তাদের এমন সব সক্ষমতা রয়েছে যা এখনও এই যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়নি। আজ সেটিই সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সি শুক্রবার (৩ এপ্রিল) এক বেনামি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য চুক্তিতে ইসরায়েল অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।





