কৃচ্ছ্রসাধনে কঠোর নির্দেশনা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ৮:০০:২৯ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক: সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ বন্ধ করে সরকারের অর্থ ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনার আলোকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি পর্যায়ে কৃচ্ছ্রের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সেখানে অতিজরুরি না হলে নতুন প্রকল্প পরিহার, সরকারি কেনাকাটায় লাগাম দেওয়া এবং সমস্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ৩০ শতাংশ কম ব্যয় পরিকল্পনা করা বা সম্পদের সাশ্রয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কৃচ্ছ্রসাধন ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারি চাকরিজীবীদের বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি মন্ত্রী-এমপিদেরও বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় কমানো এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গাড়ি কেনাসহ সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী ব্যয় বন্ধ করা, বিলাস পণ্য আমদানি আরও কঠোর করা, নতুন ভবন নির্মাণ এবং পূর্তকাজে ব্যয় কমানোর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন আমদানি নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রানীতির মাধ্যমে ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্ট করে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এ জন্য রপ্তানি বাড়াতে নতুন বাজার খোঁজা ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে করোনা পরিস্থিতি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময়েও কৃচ্ছ্রসাধন করেছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল আগ্রাসনে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হওয়ায় সরকার এমন কৌশল নিচ্ছে।
জানা গেছে, আগামী বাজেটে জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকেই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং জানালা ও ব্লাইন্ড খোলা রেখে বাইরের আলো ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা সব সময় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখতে হবে। কক্ষ ত্যাগের সময় বাতি, ফ্যান ও এসি বন্ধ করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অফিস করিডোর, সিঁড়ি বা ওয়াশরুমে অপ্রয়োজনীয় আলো জ্বালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সরকারি বিশেষ নির্দেশনা ছাড়া সব ধরনের চাকচিক্যময় আলোকসজ্জা পরিহার করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অফিস কক্ষ, সিঁড়ি ও টয়লেট নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার. নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে
বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করতে প্রতিটি দপ্তর ও সংস্থাকে অবিলম্বে একটি করে ‘ভিজিল্যান্স টিম’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধে এই সিদ্ধান্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। সূত্রটি জানায়, বাজেটের এই আকার এখনও চূড়ান্ত নয়। নতুন দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার চাইলে এতে পরিবর্তন আনতে পারে।
এ ছাড়া দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান, নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং জলবায়ু মোকাবিলায় সহায়ক খাতে বরাদ্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে এমন প্রকল্প বাছাইয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা সরকারের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের প্রাক্কলন অনুমোদিত সীমার মধ্যে রাখা, অপচয় কমানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে থোক বরাদ্দ না রাখার পরিকল্পনা এবং বাজেটকে শুধু ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের বাস্তব উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেও বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে রাজস্ব খাত থেকে ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা এবং নন-ট্যাক্স রেভিনিউ (এনটিআর) খাত থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। করবহির্ভূত রাজস্ব হতে পারে ২১ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে, যার মধ্যে ব্যাংক খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হতে পারে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে ৬ শতাংশ। মোট জিডিপির আকার দাঁড়াতে পারে ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় এই খাতে বরাদ্দও কম। এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় কমাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হতে পারে।





