অংশীজনের আপত্তি সত্ত্বেও চালু হচ্ছে অনলাইন ক্লাস, নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৩৪:০৫ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক-অভিভাবসহ বিভিন্ন অংশীজনের আপত্তি ও শিক্ষাবিদদের উদ্বিগ্ন হওয়া সত্ত্বেও আগামী সপ্তাহ থেকে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করতে যাচ্ছে সরকার| পরীক্ষামূলক ‘ব্লেন্ডেড’ শিক্ষা মডেলের আওতায় প্রাথমিকভাবে দেশের সকল মহানগর ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত স্কুলগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস করানো হবে| বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলনে সপ্তাহে তিনদিন নির্বাচিত বিদ্যালয়ে অনলাইন পাঠদানের বিষয়টি জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন| শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, মূলত চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে|
তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অনলাইনে ক্লাসের সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড়ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে| অনলাইনে ক্লাসের পরিবর্তে সরকার অন্য অফিস আদালতের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসের সময়সূচীতেও পরিবর্তন আনতে পারে| সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করতে পারে| এতে সূর্যের আলোর সঠিক ব্যবহার হবে| শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখীও হবে| জ্বালানির ব্যবহারও কম হবে| এই সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে রেখেইে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা|
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, যানজট নিরসনের লক্ষ্যে একটি পরীক্ষামূলক ‘ব্লেন্ডেড’ শিক্ষা মডেলের আওতায় মহানগর ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত স্কুলগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে| শিক্ষার্থীরা শনি, সোম ও বুধবার সরাসরি ক্লাসে উপস্থিত থাকবে| এ ছাড়া রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার অনলাইনে ক্লাস করবে| আগামী সপ্তাহ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হবে| অনলাইনে ক্লাস হলেও শিক্ষকদের প্রতিদিনই স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে|
এই পদক্ষেপটি নিয়ে প্রথম আলোচনা হয়েছিল ৩১ মার্চ, যখন মন্ত্রী বলেছিলেন যে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ হিসেবে সরকার অনলাইন এবং সরাসরি (ইন-পারসন) ক্লাসের একটি সমন্বিত পদ্ধতির কথা বিবেচনা করছে|
ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, এই উদ্যোগটি প্রাথমিকভাবে মহানগর এলাকার নির্বাচিত নামী এবং জনাকীর্ণ স্কুলগুলোতে প্রয়োগ করা হবে| বিশেষ করে সেই সব স্কুলে যেখানে অনেক শিক্ষার্থী গাড়িতে যাতায়াত করে এবং যানজট দেখা দেয়| তিনি বলেন, সরকার এই ব্যবস্থাটি সারা দেশে কঠোর নিয়ম হিসেবে চাপিয়ে দিচ্ছে না| তিনি আরও যোগ করেন, যেসব স্কুলের এই ব্যবস্থা গ্রহণ করার সক্ষমতা রয়েছে, তারা স্বেচ্ছায় এতে যোগ দিতে পারবে|
সম্ভাব্য বৈষম্য সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মিলন বলেন, শুধুমাত্র অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যই এই পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে| তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো, পড়াশোনা ব্যাহত না করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার ঘটানো|
তবে গত ৩১ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে ˆবঠকে প্রাথমিক শিক্ষকরা বলেছিলেন, তারা অনলাইন ক্লাস চান না| এতে বাচ্চারা স্কুল বিমুখ হবে| দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে কয়েকদিন ধরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে নানা আলোচনা চলছে|
তথ্য মতে, পবিত্র মাহে রামাদ্বান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দেশের স্কুল কলেজে ছুটি শুরু হয়| দীর্ঘ ৩৯ দিন ছুটি কাটিয়ে গত রোববার (২৯ মার্চ) দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হয়| ছুটি থাকায় দীর্ঘ দিন ক্লাস পরীক্ষার বাহিরে ছিল শিক্ষার্থীরা| ফলে ক্লাস শুরু হওয়ার পর আবার অনলাইনের সিদ্ধান্ত আসায় শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়তে পারে|
তবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের উপস্থিতিতে এক সেমিনারে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, তারা এ মুহূর্তে অনলাইন ক্লাস চান না| তাদের মতে এ মুহূর্তে অনলাইনে ক্লাস নেয়া হলে তাতে পড়াশোনায় ঘাটতি ˆতরি হবে|
বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের সভাপতি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব প্রিন্সিপাল দেলোয়ার হোসাইন আজিজী জানান, আমরা শিক্ষকরা কেউই অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে নই| তবে প্রয়োজনে মর্নিং শিফট চালু করে স্কুলের সময়ে এ পরিবর্তন আনা যেতে পারে| এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখন লাভেও কোনো ক্ষতির প্রভাব পড়বে না|
বাংলাদেশ আদর্শ কলেজ শিক্ষক পরিষদের সহসভাপতি অধ্যক্ষ রবিউল ইসলাম বলেন, একটি ক্লাসরুমে যেখানে দুই থেকে তিনটি লাইট-ফ্যান চালিয়ে ৫০/৬০ জন শিক্ষার্থী অফলাইনে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারবে, সেখানে বাসায় বসে অনলাইনে ক্লাসে অংশ নিতে হলে ৫০ থেকে ৬০টি ফ্যান, লাইট ব্যবহৃত হবে| এছাড়া অনলাইন ক্লাসের ফিডব্যাক কতটুকু আসবে সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে| তবে আমার বিবেচনায় প্রয়োজনে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের পরিবর্তে একদিন কমিয়ে চারদিন শ্রেণী শিক্ষাকার্যক্রম সশরীরেই অব্যাহত রাখা যেতে পারে|
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসুদ আলম জালালাবাদকে বলেন, সরকার অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার পরিবর্তে সময়সূচীতে পরিবর্তন আনতে পারতো| ক্লসের সময় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কমিয়ে আনলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে রেখেইে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতো| এতে শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখী থাকবে| দক্ষতারও বিকাশ ঘটবে| দীর্ঘ মেয়াদী অনলাইনে ক্লাস নিলে শিক্ষায় বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে|





