সিলেটে এবার ভোজ্যতেলে তেলেসমাতি!
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৬:৪০ অপরাহ্ন
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পায়তারা

স্টাফ রিপোর্টার : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দোহাই দিয়ে অস্থিতিশীল হওয়া জ্বালানি তেলের বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এবার ভোজ্যতেল নিয়ে শুরু হয়েছে তেলেসমাতি। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা বললেও স্থানীয় পর্যায়ে দেখা গেছে এর উল্টো চিত্র। সিলেটের বাজারে মিলছেনা সোয়াবিন তেল। কোথাও কোথাও সংকটের কথা বলে বিক্রি হচ্ছে বেশী দামে।
এদিকে এখনো সিলেটের বাজারে ভোজ্যতেল নিয়ে প্রশাসনের কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। যদিও আগামীকাল থেকে বাজার মনিটরিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সিলেটের বাজারের ভোজ্যতেলের সচিত্র প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রেরণের জন্য প্রস্তুত করেছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
শুক্রবার নগরীর একাধিক বাজারের কয়েকটি মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সয়াবিন তেলের সংকটে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। বেশিরভাগ দোকানে বোতলজাত ভোজ্যতেল নেই। তবে সুপারশপগুলোতে কম-বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে ৮ থেকে ১০টা মুদি দোকান খুঁজেও তেল পাওয়া যায় না। পেলেও বিক্রেতারা দাম বেশি রাখেন। বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল কিনতে গুণতে হচ্ছে ২১০ থেকে ২১৫ টাকা। যদিও তেলের বোতলের গায়ের দাম ১৯৫ টাকা।
জানা গেছে, ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে দেশজুড়ে সমন্বিত অভিযানে নেমেছে র্যাব। একদিনে ২০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মোট এক লাখ ৬৫ হাজার ২৫ লিটার ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মজুত শনাক্তের পর জব্দ করা হয়। এরমধ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জ সদর থেকে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল জব্দ করেছে র্যাব। এছাড়া শুক্রবার সিলেট ও সুনামগঞ্জে ভোজ্যতেলের মজুদের সন্ধানে অভিযান চালিয়েছে র্যাব-৯।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল রমজান ও ঈদের শুরুতে দেশব্যাপী ভোজ্যতেলের সংকট শুরু হয়। মাঝখানে কিছুটা স্বাভাবিকও হয়। তবে জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে ফের দেশব্যাপী শুরু হয় ভোজ্যতেলের সংকট। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন ফের তেলের দাম বাড়াতেই বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানী। অন্যদিকে প্রায় মাসখানেক ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে রোজার আগে বাড়তে শুরু করা তেলের দাম ঈদের পর আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এবার নানা অজুহাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। ফলে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর। বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
আর বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরবরাহে ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতা সব মিলিয়েই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চাহিদা মতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে মানতে হচ্ছে অন্য পণ্য নেওয়ার শর্ত। তেল নিয়ে এমন তেলেসমাতির সুযোগে ক্রেতা পড়েছেন বিপাকে। কেউ কিনছেন চাহিদার অতিরিক্ত তেল, কেউ আবার সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছেন।
অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সরবরাহে প্রকৃত সংকটের চেয়ে সিন্ডিকেটের তৎপরতাই বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বাজারে দাম বাড়লে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়াতে পারে, সে জন্য বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
যদিও সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দাবি করেছিলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতার বিষয়ে কথা বলেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছিলেন, আর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার মতে, দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে দ্রুতই তার প্রভাব সব পর্যায়ের বাজারে পড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তা সেই সুফল খুব কমই পান। খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বেশি দামে তেল কিনে থাকলে বেশি দামে বিক্রি করাটা স্বাভাবিক। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের কাছে ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার থাকা জরুরি।
জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়ানোর জন্য বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে একধরনের চাপ তৈরি করেছেন। তাঁরা প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারের কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দিলেও বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে খোলা তেল।
এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক দেবানন্দ সিনহা বলেন, সিলেটের বাজারে ভোজ্যতেলের সংকটের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে বাজার পরিস্থিতির চিত্র জানতে চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। রোববার থেকে সিলেটের বাজারে অভিযান শুরু হবে। কারো কাছে তেল মজুদের তথ্য থাকলে কিংবা বেশী মূল্য রাখলে ভোক্তা অদিধপ্তরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে সিলেটের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আবুল সালেহ মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, কেন্দ্র থেকে ভোজ্যতেলের বাজারের সচিত্র প্রতিবেদন সংগ্রহের জন্য আমাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমি বৃহস্পতিবার সিলেটের বিভিন্ন বাজারের পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতার সাথে কথা বলেছি। সবাই বলছে কোম্পানীগুলো তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য দাম বৃদ্ধি করা। ফলে কোম্পানীগুলো চাহিদার ১০ থেকে ১৫ ভাগ তেল বাজারে সরবরাহ করছে। এতে খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতারা চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। আমি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন রেডি করেছি। সেটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবো।




