আমেরিকা-ইরান আলোচনা শুরু : নতুন ভোরের অপেক্ষায় বিশ্ব
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২:৫০:৫০ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শনিবার শুরু হয়েছে বহু প্রতিক্ষিত ইরান-আমেরিকা শান্তি বৈঠক। পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় এই আলোচনা শেষে মধ্যপ্রাচ্যে কী শান্তি ফিরবে-সেদিকেই তাকিয়ে সবাই। চিরবৈরী দুই দেশের আলোচনা শেষে একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় বিশ^।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা। ইরানের ৭০ জনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাকের কালিবাফ। তেহরান সঙ্গে এনেছে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞও। অন্যদিকে, শনিবার ভোরে ইসলামাবাদে নেমেছে মার্কিন বিশেষ বিমানও। আমেরিকার প্রতিনিধি দলে রয়েছেন খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনার। আলোচনার আগে আমেরিকাকে কয়েকটি পূর্বশর্ত দিয়েছে ইরান। কঠিন শর্ত দিয়েছে আমেরিকাও।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে এই আলোচনা চলছে। দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনা করছেন নাকি পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আলোচনা চলছে, তা রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আল-জাজিরা বলছে, পাকিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একই কক্ষে বসে আলোচনা করছেন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হবে। ইতিবাচক অগ্রগতি হলে পরবর্তীতে সরাসরি আলোচনাও হতে পারে।
তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, দু’পক্ষ ইসলামাবাদে উপস্থিত থাকলেও এখনও পর্যন্ত ইরান-আমেরিকা সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসেনি। এর মূল কারণ হল ইরানের দেওয়া শর্তগুলিতে এখনও সম্মত হয়নি ওয়াশিংটন। তবে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সেরেছেন মার্কিন উপ রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, আমেরিকা এবং ইরানের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে বৈঠক করেছেন পাক কর্তারাও। এরপর পাকিস্তান-ইরান-আমেরিকার ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা।
এদিকে, আলোচনা শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলমান সংঘাতে ইরান ‘ভয়াবহভাবে হারছে’।
তেহরানের দেওয়া প্রধান শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতির দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সেনা মোতায়েন বা সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে পারবে না আমেরিকা। এছড়াও হরমুজে চলাচলকারী জাহাজগুলির উপর ‘ট্রানজিট ফি’ বা কর বসানোর দাবিও জানিয়েছে ইরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পুরোপুরি অবিশ্বাস’ নিয়ে ইরান আলোচনায় বসছে।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের সঙ্গে আলাপকালে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন বলে খবর দিয়েছে ইরানি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ।
আরাগচি বলেন, ইরান তার দেশের জনগণের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় পুরো শক্তি দিয়ে লড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে তিনি ওয়াশিংটনের অতীতের নানা কর্মকাণ্ডকে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ’ ও ‘কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অন্যদিকে বৈঠকের আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স বলেছেন, আমরা আলোচনার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। আমার মনে হয়, ইতিবাচক বৈঠক হবে।
কূটনীতিকদের মতে, গত দেড় মাসের যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান গভীর আস্থার সংকটের কথা চিন্তা করলে এই পরোক্ষ আলোচনার শুরুটিও পাকিস্তানের জন্য এক বিশাল অর্জন। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে থাকলেও, তাদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা ইসলামাবাদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।
পাকিস্তান সরকার ও মধ্যস্থতাকারীদের মূল লক্ষ্য হলো এই পরোক্ষ আলোচনাকে সরাসরি বা ‘মুখোমুখি’ বৈঠকে রূপান্তর করা। যদি শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রতিনিধি দলের মধ্যে সরাসরি বৈঠক সম্ভব হয়, তবে তা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও বাস্তবমুখী সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে।
কূটনৈতিক মহলে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হলো-এই প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কী ফলাফল আসে। তবে আপাতত তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। প্রথমত, একটি দীর্ঘমেয়াদি বা বর্ধিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা আসবে কি না। দ্বিতীয়ত, কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে দুই পক্ষ পৌঁছাতে পারবে কি না। তৃতীয়ত, অন্তত ভবিষ্যতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি মিলবে কি না।
যদিও পথটি এখনো অনেক বন্ধুর, তবুও ইসলামাবাদের এই তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশ্বের নজর এখন এই পরোক্ষ আলোচনার পরবর্তী ধাপের দিকে।




