সিডস অব সাদকাহ’র আয়োজনে রাজকীয় বিয়ে: সিলেটে ৬৩ এতিম কন্যার স্বপ্নের দিন
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ২:০০:২৮ অপরাহ্ন
মুনশী ইকবাল :

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বৈশাখের ঝলমলে রোদ বেশ আলো ছড়াচ্ছে। আগের রাতের ঝড়ো আবহাওয়ার কোনো রেশ নেই কোথাও। বেলা গড়িয়ে তখন এগারোটা। শহরতলীর বালুচরের একটি অভিজাত কনভেনশন হলে তখন দারুন ব্যস্ত সবাই। ফুল রঙিন কাপড় দিয়ে সাজানো হয়েছে ফটক। ভেতর থেকে স্পিকারে কচিকাঁচাদের কণ্ঠে ভেসে আসছে –
“আইলা রে নয়া দামান, আসমানের তেরা
বিছানা বিছাইয়া দিলাম শাইল ধানের নেড়া
দামান বও
বও দামান কও রে কথা, খাও রে বাটার পান
যাইবার কথা কও যদি কাইট্টা রাখমু কান
দামান বও”
একে একে আসতে শুরু করেছেন বিশিষ্টজনেরা। সারাদেশ থেকে তারা এসেছেন, অতিথিরা এসেছেন দেশের বাইরে থেকেও। এই কনভেনশন হলে নিয়মিত নানান অনুষ্ঠান আয়োজন হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবারের এই আয়োজন এর আগে এরকম হয়নি এখানে। কিছুক্ষণ পরেই ঐতিহাসিক এক সময়ের সাক্ষী হলো আধ্যাত্মিক নগরী।
ইতিমধ্যে শিল্পীদের সমন্বিত কন্ঠে ভেসে উঠেছে –
সিলেট ফাইলে যেমন তেমন
ঢাকাত পাইলে কই আসইন কেমন
লন্ডন পাইলে ধরিয়া কই ও আমার সিলটি ভাইসাব
রে আমার সিলটি ভাইসাব
মুহূর্তে পুরো হলরুম কড়তালিতে মতোয়ারা হয়ে ওঠে। সিলেটের বাইরের অতিথি ও বরের আত্মীয়স্বজনরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন গানের অনুবাদ নিয়ে। এমনি এই উৎসবমুখর পরিবেশে এখানে আয়োজন করা হয়েছে একসাথে রংপুর ও সিলেট অঞ্চলের ৬৩ জন এতিম মেয়ের বিয়ের। ইংল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিডস অব সাদকাহ এর আয়োজনে বিনা খরচে ১২৬ জোড়া হাত এক হলো।
বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল বিরাট আয়োজন। যৌতুকবিহীন এই বিয়েতে দেশে বিদেশ থেকে বিশিষ্টজনের সম্মিলন ঘটে। বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. রেদওয়ানুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর। সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন রংপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর ৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান বেলাল। সিডস অব সাদাকাহ এর পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন আবুল খায়েল এবং জয়নুল আবেদীন রুহেল। এসময় তারা বলেন আমরা আশাকরি আজ যাদের হাত আমরা এক করে দিতে পেরেছি তারা একটি আদর্শ পরিবার হবেন। যৌতুক বিহীন বিয়ে যে চাইলেই সম্ভব এই বিয়ে তার প্রমাণ। বর্তমান সময়ে বিয়ে এক কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কিন্তু নবী সা. বিয়ে সহজ করতে বলেছেন। আমরা চেষ্টা করছি বিয়েকে সহজীকরণের প্রয়াসে নিজেদের অবস্থান থেকে অবদান রাখতে।
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ শায়খ শাহ ওয়ালীউল্লাহ বিয়ের খুতবা দেন এবং এক এক করে ৬৩টি বিয়ে পড়ান। পরে সবার সুখ ও শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হয় এবং বিয়ের অতিথিদের জন্য মধ্যহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।
বিয়েতে নবদম্পতির জন্য খাট-পালংসহ ফার্নিচার প্রদান করা হয়। এছাড়া বর কনেকে আলাদা আলাদা উপহার প্রদান করা হয়। এরমধ্যে বরের সাথে দেওয়া হয়েছে, পায়জামা-পাঞ্জাবী, জুতা, স্যান্ডেল, শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি, লুঙ্গি, টাওয়েল/গামছা, টুথপেস্ট ও টুথব্রাশ, পাগড়ি/ক্যাপ, রুমাল, ঘড়ি, মোজা, ঘরের জিনিষ পত্র, বেড সীট, তোষক, লেপ/কম্বল, বালিশ, মশারি, ডিনার সেট, ভাত- তরকারী-ডালের পাতিল, কড়াই, তাওয়া, চামচ সেট, জগ, গ্লাস, লবণদানী, ভাত ও তরকারীর গামলা, বালতি
মগ, মাদুর, প্রেসার কুকার।
কনের জন্য দেওয়া হয় লিপস্টিক, লিপ লাইনার, ফেস পাউডার, শাম্পু, নারিকেল তেল, সাবান ও সোপ বক্স, পাউডার ও পাউডার বক্স, টুথ পেস্ট ও টুথ ব্রাশ, চিরুনী, তোয়ালে, রুমাল, কাজল, চুলের ক্লিপ ও চুলের কাটা, বডি লোশন, মেহেদি টিউব, আয়না, সেফটিপিন, লাল চুড়ি, ওড়না, স্যান্ডেল, ব্যাগ, খড়ি, শাড়ি (বেনারসি), সুতি শাড়ি, সেলোয়ার কামিজ, ব্লাউজ, পেটিকোট, বনের অপয়ার, মোজা, কানের দুল, ট্রলি ব্যাগ, সিটি গোল্ড চুড়ি, জায়নামাজ, আংটি, কোরআন শরীফ, গহনা (সিটি গোল্ড), বোরকা/স্কার্ফ, মেয়ে সাজানো গায়ে হলুদের শাড়ী ও ব্লাউজ।
বিয়েতে উপস্থিত বর এবং কনের অভিভাবকরা এরকম আয়োজনে খুবই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তারা বলেন এটি তাদের এক স্বপ্নের দিন, স্মরণীয় দিন। যারা এই সুন্দর দিন তাদের উপহার দিতে চেষ্টা করেছেন তাদের প্রতি তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যৎ সুন্দর সাংসারিক জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
এরআগে বুধবার মেহেদী সন্ধ্যায় আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। এতে বর কনে উভয় পক্ষের লোকজন অংশ নেন। বর কনে ও তাদের সাথে আসা অতিথিদের জন্য সিলেটের আলাদা দুটো অভিজাত হোটেল বুকিং করে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।




