ভোজ্য তেলের দাম বাড়ল লিটারে ৪ টাকা : দ্রব্যমূল্যের চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬:২৩ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের কর্মজীবীরা। এরইমধ্যে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে লিটার প্রতি ৪ টাকা।
গতকাল বুধবার বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ১৯৫ টাকা থেকে ১৯৯ টাকা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ভোজ্যতেলের বাজারমূল্য নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, বোতলজাত তেলের পাশাপাশি খোলা তেলেও লিটারে ৪ টাকা বৃদ্ধি করে ১৭৫ টাকা থেকে ১৭৯ টাকায় বিক্রি হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সারা বিশ্বেই পণ্যের উৎসে মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা আশা করি আমাদের ভোক্তার বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি দেখবেন। এতে বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতিও আগের চেয়ে স্বাভাবিক হবে।
প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। অনেক সময় ক্রেতারা কয়েক দোকান ঘুরেও সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না। ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে জানা গেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট সব মিলিয়ে পণ্যমূল্য বাড়ছে।
নগরসহ সিলেটের বিভিন্ন এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষ জানাচ্ছেন, আয় না বাড়লেও প্রতিদিনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রিকশাচালক রফিক মিয়া বলেন, ‘আগে ৫০০ টাকায় বাজার হতো, এখন ৮০০ টাকাতেও ঠিকমতো হয় না।’ অন্যদিকে গৃহিণীরা বলছেন, ‘ঘরে পর্যাপ্ত রসদ নেই, বাধ্য হয়ে খাবারের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে।’
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার চাপও দেশের বাজারে প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের ভোক্তা পর্যায়ে।
নগরের তাঁতীপাড়া এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নজিব রহমান বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি, আমদানি সহজীকরণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি কার্যক্রম বাড়ানো না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।’
এদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বিএনপি সরকার। এর মধ্যে চলতি মাসে দুই দফায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজির) দাম কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা বেড়েছে। এতে বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ৬০০ টাকা দাম বেড়েছে। তবে বাজারে এর চেয়ে বাড়তি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হয়।
দেশে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দামও বাড়িয়েছে সরকার। তাতে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা ও পেট্রলে ১৯ টাকা দাম বেড়েছে। এসব জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পণ্যের দামে।
নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বেগম জানান, তিনি একটি বাসায় পরিচারিকার কাজ করেন। এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসেই বাসায় রান্না হয়। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিনে সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকা বাড়ছে। অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে। আমাদের দিন আনতে পান্তা ফুরায়, এখন আরও অবস্থা খারাপ।’
সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম ৪৫ শতাংশ ও ব্রয়লার মুরগির দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে।
গত দুই সপ্তাহে বাজারে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে। এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা জানান, গাড়িভাড়া বাড়ায় পাইকারি বিক্রেতারা ডিমের দাম বাড়িয়েছেন।
এদিকে বাজারে এখনো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি মুরগি। গতকাল প্রতি কেজি হাইব্রিড সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩২০-৩৩০ টাকায় আর সোনালি ৩৫০-৩৬০ টাকায়। অন্যদিকে বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৯০ টাকায়।
নগর্রে বিভিন্ন বাজারে গতকাল বুধবার ছোট আকারের রুই মাছ ৩০০-৩৮০ টাকা এবং তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ ২৫০-২৮০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
গত কয়েকদিন টানরা বৃষ্টির কারণে বাজারে গ্রীষ্ম মৌসুমের সবজির সরবরাহ কম। বাজার ঘুরে দেখা যায়, গ্রীষ্মের সবজির দাম বেড়েছে।
বাজারে বর্তমানে আলু ছাড়া ৫০ টাকা কেজির নিচে তেমন কোনো সবজি কেনা যায় না। বেশির ভাগ সবজির দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। আর বেগুন, কাঁকরোলের মতো দু-তিনটি সবজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার ওপরে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর দৈনিক ১৫টি সবজির খুচরা দামের তালিকা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে নয়টি সবজির দাম বেশি; আর দাম কম রয়েছে চারটি সবজির। দাম বেশি বেড়েছে দেশি টমেটো, মিষ্টিকুমড়া ও করলার। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি টমেটো ৫০-৬০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৫০ টাকা ও করলা ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
নগরের ব্রহ্মময়ীবাজারের সবজি বিক্রেতা তাহের মিয়া জানান, বাজারে গ্রীষ্ম মৌসুমের সবজির সরবরাহ কম। ফলে গ্রীষ্মের সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে।
খুচরা দোকানে এখন প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে ৫ টাকা কম ছিল। গত এক সপ্তাহে বাজারে মাঝারি চালের (বিআর-২৮ ও পাইজাম) দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। এসব চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। আর মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৩ টাকায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, এক মাসের ব্যবধানে মোটা ও মাঝারি চালের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দেখিয়েছেন খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা। তাঁরা জানান, গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে বেশ কিছু পণ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ায় দেশে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। সরবরাহ–সংকট থেকেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আর সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। অনেক সময় ক্রেতারা কয়েক দোকান ঘুরেও সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না। ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে চায়। কিন্তু সরকার এখনো অনুমতি দেয়নি। তবে ইতিমধ্যে কোম্পানিগুলো ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়িয়েছে। এ কারণে ভোক্তাদেরও আগের চেয়ে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
নগরের আম্বরখানা বাজারের মুদি দোকানী শফিক মিয়া বলেন, ‘বাজারে বোতলের সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে। কোম্পানিগুলো আমাদের কাছে গায়ের রেটে (এমআরপি) তেল বিক্রি করে। তাহলে গ্রাহকদের কাছে আমরা বেচব কত টাকায়।’
বাজারে একসঙ্গে অনেকগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তারা, বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষেরা খরচের চাপে পড়েছেন। পরিবহন খরচসহ সামগ্রিকভাবে পণ্যের দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগকে পুঁজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।





