সিলেটে জুলাই ঐক্যের আলোচনা সভা গণভোটের রায় উপেক্ষা প্রতারণার শামিল : সাবেক ভিসি ডা. পাটোয়ারী
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ মে ২০২৬, ৮:৩১:৩৬ অপরাহ্ন
কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হলে ৫ বছর পর অটোমেটিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হবে: অ্যাড. শিশির মনির

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. ইসমাঈল পাটোয়ারী বলেছেন, যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছিল ধীরে ধীরে সেই স্বপ্ন পূরণের সকল পথ বন্ধ করা হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের উচিত ছিল সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে জুলাই আকাঙ্খাকে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তারা উল্টো পথে হাঁটছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিএনপি জুলাই সনদকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, আবার সংসদ অধিবেশনে দেখলাম সরকারের মন্ত্রী বলছেন তখন যদি নির্বাচন না দেয় সেই আশঙ্কা থেকে বাধ্য হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। জনগণ তাহলে কোনটা বিশ্বাস করবে?
তিনি বুধবার (৬ মে) বিকেলে ‘জুলাই ঐক্য’ সিলেট আয়োজিত বহুল প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে গৃহিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘গণরায় বাস্তবায়ন ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপরোক্ত কথা বলেন।
সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূরের সভাপতিত্বে এবং জুলাই ঐক্য সিলেটের অন্যতম সমন্বয়ক সিলেট জেলা বারের আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রবের সঞ্চালনায় নগরীর দরগাগেইটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-কেমুসাসের শহীদ সুলেমান হলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের যারা রক্ষা করে তাদেরকে তারা রক্ষা করতে পারেনা, ফলে এর পরিণতি তাদেরকেই বরণ করতে হয়। ১৯৭৫ সালে বিএনপিকে যারা ক্ষমতায় আনার পথ তৈরী করেছিল বিএনপি তাদের তারা রক্ষা করতে পারেনি। এবারো ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ করে দিলো তাদেরকেও তারা রক্ষা করতে চায়না। এজন্য তাদেরকে ভবিষ্যতেও তাদের কঠোর মুল্য দিতে হবে। কারণ জুলাই সনদ উপেক্ষা ও গণভোটের রায় বাতিলের সিদ্ধান্ত বিএনপিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আমাদেরকে এখন কোনটা সংস্কার কোনটা সংশোধন সেটা শেখানো হচ্ছে। অথচ জুলাই সনদের প্রথম কথাই হচ্ছে সংস্কার। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। কিন্তু বিএনপি জাতির সাথে প্রতারণা করেছে, তারা আবার সেই কথা বড় গলায় সংসদেও তুলে ধরছে। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী বলছেন- ঐসময় জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলে যদি নির্বাচন না দেয়, তাই রাজী হয়েছিলাম। একজন মন্ত্রী পার্লামেন্টে এমন প্রতারণামুলক বক্তব্য দিতে পারেননা। এই ঘটনা বিশ্বের অন্য কোন দেশে হলে ইতোমধ্যে তাকে পদত্যাগ করে চলে যেতে হতো।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির আরও বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা না হয় তাহলে তাদের জন্য খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে। আমাদের বিশ্বাস বিএনপির শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ কেমুসাসের সভাপতি ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান, শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ, সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী, এনসিপি সিলেট মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক নেসারুল হক চৌধুরী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই যোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন শিশির। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জুলাই ঐক্য সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক ড. নূরুল ইসলাম বাবুল।
বক্তব্য রাখেন- শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল এন্ড কলেজ মিরাবাজারের অধ্যক্ষ গোলাম রব্বানী, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হোসাইন আহমদ ও সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন। সভার শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার। সংগীত পরিবেশন করেন দিশারী শিল্পীগোষ্ঠীর সাবেক পরিচালক বিশিষ্ট শিল্পী আলিফ নুর।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সভাপতি ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান বলেন, ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে রায় দিয়ে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। গণরায়কে উপেক্ষা করলে বিএনপি তাদের ধবংস ডেকে আনবে। জুলাই আকাঙ্খা পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত বিএনপি এবং দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবেনা। সরকার যত দ্রুত এটা অনুধাবন করবে ততই তাদের জন্য ভালো।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ বলেন, ছাত্র-জনতার আত্মদানকে মুল্য দিতে হবে। দেশকে ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত করতে ছাত্র-জনতা নিজেদের জীবনের পরোয়া করেনি। বর্তমান সরকারী দল বিএনপিসহ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সকল দল মিলে জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছিল। তাই বর্তমান সরকারকে গুরুত্বের সাথে এটিকে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, জামায়াতে ইসলামী শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়নি। জাতির সকল ক্রান্তিলগ্নে জামায়াত গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভুমিকা পালন করেছে। বিএনপি অতীতের ইতিহাস ভুলে গেছে। তারা জুলাই সনদকে উপেক্ষা ও গণভোটের রায় বাতিল চেষ্টার মাধ্যমে বিএনপি ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটা শুরু করেছে। এ থেকে বিরত নাহলে তাদেরকেও ফ্যাসিস্টদের পরিণতি বরণ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের কারণেই আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশে আসতে পেরেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিলং থেকে এসে আজ মন্ত্রী হয়েছেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত পরিবেশে সম্মানের সহিত দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে সব ভুলে গেছে। তারা নতুন ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
জুলাই ঐক্য সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক ড. নূরুল ইসলাম বাবুল বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর এখনো পূর্ণ হয় নাই। এরই মধ্যে আমাদেরকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। বিষয়টি জাতির জন্য লজ্জাকর।
সভাপতির বক্তব্যে মুকতাবিস-উন-নূর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দিনগুলো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের আকাঙ্খাকে বাস্তবায়ন করা না হলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবেনা। তিনি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের স্বার্থে জুলাই সনদ বাস্তবায়নক্রমে দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার সকল পথ চিরতরে বন্ধ করার জন্য বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান।





