শিশু ফাহিমা হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন ঘাতক জাকির
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ মে ২০২৬, ৯:৪২:৫৪ অপরাহ্ন
সন্দেহ দুর করতে খোঁজায়ও ছিলেন সক্রিয়

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটে চাঞ্চল্যকর চার বছরের শিশু ফাহিমার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। আটক জাকির নিহত শিশুটির প্রতিবেশী এবং এলাকার সম্পর্কে ‘চাচা’ বলে পরিচিত ছিল।
সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়। এখবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাতেই জালালাবাদ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন তারা। একই সঙ্গে মধ্যরাতে অভিযুক্ত জাকিরের বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক প্রেস ব্রিফিং-এ বিস্তারিত তুলে ধরেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এইসময় তিনি আটককৃত জাকিরের বরাত দিয়ে শিশু কণ্যাটিকে ধর্ষণ ও হত্যার লোমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের পর তার উপর থেকে সন্দেহ দুর করতে অভিযুক্ত জাকির এলাকাবাসীর সঙ্গে শিশুটিকে খোঁজাখুঁজি এবং আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিল বলেও তিনি জানান।
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর এলাকাবাসী যখন ফাহিমাকে খুঁজছিল, তখন অভিযুক্ত জাকিরও তাদের সঙ্গে ছিল। এমনকি পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার সময়ও সে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।
তিনি বলেন, আমরা সকলে এলাকায় গিয়েছি, আমি নিজে গিয়েছি। থানার নারী-পুরুষ সব সদস্য গিয়েছি, আমরা চেষ্টা করেছি, মানুষের সঙ্গে মিশে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে। সেও (জাকির) চালাক প্রকৃতির। সেও আমাদের সঙ্গে মিশে মিশে এই ঘটনাগুলো সে দেখেছে। এরপর চাপ যখন বেশি পড়েছে তখন সে নিজেই এগুলো বের করেছে।
জাকিরকে সন্দেহ হওয়ার কারণ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনের পর সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিলো এলাকার কেউ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই এলাকার প্রতিটি মানুষের তথ্য আমরা সংগ্রহ করছিলাম। ওই এলাকায় আমরা তিনজন সন্দেহভাজককে সনাক্ত করি। যারা মাদকাসক্ত বা পূর্বে এধরণের কাজের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে জাকিরকে আটক করলে সে সব স্বীকার করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ মে সকালে ফাহিমাকে একটি দোকান থেকে সিগারেট এনে দিতে পাঠানো হয়। শিশুটি সিগারেট এনে দেওয়ার পর জাকির তাকে নিজের ঘরে ডেকে নেয়। সে সময় তার স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। জিজ্ঞাসাবাদে জাকির জানিয়েছে, ঘরের দরজা বন্ধ করে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। তবে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ প্রথমে ঘরের ভেতরে একটি ব্রিফকেসে লুকিয়ে রাখা হয়। এলাকায় খোঁজাখুঁজি শুরু হলে সেটি বাড়ির নিচে সরিয়ে রাখা হয়। পরে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে গভীর রাতে পাশের একটি ডোবায় মরদেহ ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে মরদেহ পানিতে না ডোবায় সেটি পাশেই ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অভিযুক্তের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাদর ও ব্রিফকেস উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব আলামত তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষার জন্য জব্দ করা হয়েছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত সরাসরি অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর ধর্ষণের অভিযোগ যুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, মাদক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিলেট মহানগরে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি তা আরও জোরদার করা হবে।
এসময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মন্জুরুল আলমসহ এসএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য- নিহত শিশু ফাহিমা সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। রাইসুল হক স্থানীয় বাজারে একটি দোকানে দিনমজুরের কাজ করেন। গত শুক্রবার বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুদিন আগে সে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিলো। এই ঘটনায় পুরো দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।





