১৯ মে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক
প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ মে ২০২৬, ১২:২৭:৪১ অপরাহ্ন
দুই শ্রমিক নিহতে পাল্টাপাল্টি মামলার জের

স্টাফ রিপোর্টার : নগরীর কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পরিবহন শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনায় ২ শ্রমিকের মৃত্যু ঘিরে পরিবহন সেক্টরে চলছে পাল্টাপাল্টি মামলার জেরে এবার পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। আগামী ১৯ মে ভোর ৬টা থেকে সিলেট বিভাগে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘটের ঘোষণা করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বিভাগীয় কমিটির নেতারা।
বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর দক্ষিণ সুরমায় ফেডারেশনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরী সভায় মামলা থেকে কমিটির বিভাগীয় সভাপতি ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক আলী আকবর রাজন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদসহ শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক নেতাদের নাম প্রত্যাহারের দাবীতে ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। তবে ফেডারেশনের বিভাগীয় সহ-সভাপতি ও জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিমের নাম সংযুক্ত না করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন শ্রমিক সংগঠনের কেউ কেউ। তাদের দাবী যেহেতু পাল্টাপাল্টি মামলায় আব্দুল মুহিম আসামী কর্মসুচীতে তার নামও যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। এর মাধ্যমে মুলত শ্রমিক সংগঠনের বিভক্তি প্রকাশিত হলো। যা শ্রমিকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
জানা গেছে, গত ২৭ এপ্রিল নগরীর কদমতলীস্থ সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সিলেট-জগন্নাথপুর রুটে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে বিভিন্ন বাস ও টিকিট কাউন্টার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিক শ্রমিক আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও পরে সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এই ঘটনায় ৭ জন শ্রমিককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে চিকিৎসাধিন থাকা অবস্থায় ২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
গত ২ মে চিকিৎসাধিন অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান পরিবহন শ্রমিক রিপন আহমদ (৩০)। এই ঘটনায় নিহতের বাবা গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী উত্তর গ্রামের ছাবলু মিয়া গত ৫ মে দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলায় সিলেট জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলামকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় সাবেক ছাত্রদল নেতা ও শ্রমিক ইউনিয়নের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন (৩৬)-সহ মোট ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে গত ৭ মে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় মারা যান অপর শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন (৩৫)। এই ঘটনায় নিহতের বাবা সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার বাঘবাড়ী গ্রামের মোঃ আজির উদ্দিন দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিমসহ ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত আরো ১০/১৫ জনকে আসামী করা হয়।
দুটি মামলাই বর্তমানে তদন্তাধিন রয়েছে বলে জানিয়েছেন এসএমপির দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি আশরাফুজ্জামান।
এদিকে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস শহিদ, সাবেক কোষাধ্যক্ষ সামছুল হক মানিক ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নুর মিয়াসহ শ্রমিক নেতৃবৃন্দের উপর মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আগামী ১৯ মে রোজ মঙ্গলবার ভোর ৬ টা থেকে বিভাগে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। সভায় ফেডারেশনের বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রতিনিধিত্বশীল সড়ক পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সজিব আলীর পরিচালনা অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন- সুনামগঞ্জ জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক, সুনামগঞ্জ জেলা ট্রাক পিকাপ কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজুর নুর, সাধারণ সম্পাদক নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ জেলা সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কালা মিয়া, মৌলভীবাজার জেলা ট্রাক পিকাপ কার্ভাড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি অদুদ আহমদ, সিলেট জেলা ট্রাক পিকাপ কার্ভড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি কাওসার আহমদ, কোষাধ্যক্ষ বাদল আহমদ, সিলেট জেলা সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক আজাদ মিয়া, সিলেট জেলা ইমা লেগুনা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইনসান আলী, সিলেট জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহ সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত আবুল, প্রচার সম্পাদক হারিছ আলী প্রমূখ।
সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ২৭ এপ্রিল সিলেট কদমতলী বাস টার্মিনালে একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠনের বিভাগীয় সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ নিরপরাধ শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে আসামী করার ঘটনায় সর্বস্তরের শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ। আমরা উক্ত ঘটনা ও অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবী জানাচ্ছি। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের ঐক্য বিনষ্টের কোন ষড়যন্ত্র শ্রমিক সমাজ মেনে নিবেনা। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি সেদিন ঘটনার সময় ফেডারেশনের বিভাগীয় সভাপতি হাজী ময়নুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুস শহিদসহ শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ নাজিরবাজারে শ্রমিক সংগঠনের নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা ঘটনা শুনে সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। সেই ঘটনায় নিরীহ শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে আসামী করা হয়েছে, যা দুঃখজনক। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে আগামী ১৯ মে ভোর ৬টা থেকে সিলেট বিভাগে সর্বাত্মক সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতি সফলের জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সিলেট বিভাগীয় সহ-সভাপতি ও জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিম বলেন, নেতৃবৃন্দের মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হলো কিন্তু আমার নাম সংযুক্ত করা হলোনা। অথচ আমি দুটি মামলার আসামী। তবুও উক্ত কর্মসূচীতে আমার সম্মতি রয়েছে। আমার বিশ^াস বিভাগীয় নেতৃবৃন্দে কর্মসুচীতে আমার মামলা প্রত্যাহারের দাবীর বিষয়টি সংযুক্ত করবেন।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সেক্রেটারী মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের মধ্যে মারামারি হলো, দুজন মারা গেলো। এর জের ধরে মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে ধর্মঘট আহ্বানের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা আইনের শাসনের পরিপন্থি। যেখানে জনগণের কোন সম্পৃক্ততা নেই, সেখানে জনগণকে জিম্মি করে কর্মসূচী পালন কোনভাবেই সঠিক প্রতিবাদ হতে পারেনা। এব্যাপারে পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে মনে আমি মনে করি।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, শ্রমিক সংগঠনের সংঘর্ষে দুটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে মামলা হওয়া স্বাভাবিক আইনগত প্রক্রিয়া। পুলিশ প্রশাসন মামলার তদন্ত করছে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা সহ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রকৃত আসামীরা আইনের আওতায় আসবে। এটিকে কেন্দ্র করে পরিবহন ধর্মঘটের নামে জনগণকে জিম্মি করার সুযোগ নেই। পরিবহন শ্রমিক নেতাদেরকে এই ধরণের জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মসূচী পালন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, পরিবহন শ্রমিক নেতাদের সাথে কথা হয়েছে। আজ শনিবার তাদের সাথে একটি সভা হবে। উক্ত সভায় বিস্তারিত আলাপ হবে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এমন কর্মসূচী পালনের কোন সুযোগ দেয়া হবেনা।





