বর্জ্য অপসারণে সিসিকের ‘বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ’
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ মে ২০২৬, ৩:৪০:৫৭ অপরাহ্ন
দ্রুত পরিচ্ছন্নতার লক্ষ্য সিসিকের

মামুন পারভেজ :
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ কোরবানি বর্জ্য দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে অপসারণে অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। পলিথিন বা প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে এবার সিসিকের পক্ষ থেকে কোরবানিদাতাদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে বিশেষ পরিবেশবান্ধব ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ (পচনশীল) ব্যাগ। তবে চাহিদার তুলনায় বাজেট স্বল্পতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতার মাঝেই ঈদের দিন সকাল থেকে পুরোদমে শুরু হয়েছে বর্জ্য অপসারণের কাজ।
আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সরেজমিনে নগরের পাঠানটুলা রোড, আম্বরখানা ও ফাজিলচিশতসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সিসিকের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সবুজ রঙের বিশেষ বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগে কোরবানি বর্জ্য সংগ্রহ করছেন।
দুপুরের দিকে দেখা যায়, নগরের প্রধান প্রধান সড়ক ও আবাসিক এলাকাগুলো থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে সিসিকের নিজস্ব ও ভাড়াকৃত ট্রাকে লোড করা হচ্ছে।
সিসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রায় সহস্রাধিক শ্রমিক একযোগে কাজ করছেন। বর্জ্য পরিবহনের জন্য সিসিকের নিজস্ব ৬০টি ট্রাকের পাশাপাশি আরও ৫৫টি ভাড়া করা ট্রাক সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে।
সিসিকের এই অভিনব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নগরবাসী। নগরের আম্বরখানা এলাকার বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তা নাসিম আহমদ তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিসিকের দেওয়া সবুজ ব্যাগের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “সিলেট সিটি করপোরেশনকে এই অভিনব উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ। এতে করে কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণ অনেকটা সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত হবে। নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও এই পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করা উচিত।”
তবে এই প্রশংসার পাশাপাশি অনেক কোরবানিদাতার মনে ক্ষোভ ও আক্ষেপও দেখা গেছে। নগরের কোরবানিদাতার সংখ্যার তুলনায় ব্যাগের সরবরাহ কম থাকায় অনেকেই এই ব্যাগ পাননি। ফাজিলচিশত এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার অভিযোগ করে বলেন, “সিসিকের পক্ষ থেকে আমি কোনো ব্যাগ পাইনি। তবে আশেপাশের অনেকেই পেয়েছেন। সবার কাছে এই ব্যাগ পৌঁছানো উচিত ছিল।”
সিসিক সূত্রে জানা গেছে, এবার নগরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। সিসিকের পক্ষ থেকে তালিকা তৈরি করে প্রায় ৩০ হাজার ব্যাগ বিতরণ করা হয়। প্রতি পিস ব্যাগের মূল্য পড়েছে ৫১ টাকা, যা কোরবানিদাতাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ব্যাগ ২৫ কেজি বর্জ্য ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু অনেক পরিবারে একাধিক পশু কোরবানি হওয়ায় দুটি করে ব্যাগের প্রয়োজন ছিল। বাজেট স্বল্পতার কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সবাইকে বা পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যাগ দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেছে সিসিক কর্তৃপক্ষ।

কোরবানি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিসিকের এই পদক্ষেপকে দেশের পরিবেশ রক্ষায় একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তবে তারা এটিকে শুধু ঈদকেন্দ্রিক না রেখে বছরব্যাপী স্থায়ী করার দাবি জানিয়েছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও বর্জ্য ফেলার জন্য এই ধরনের পচনশীল ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। বাজেট স্বল্পতা দূর করতে বড় ব্যাগের পাশাপাশি কম ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন (৫-১০ কেজি) ছোট ব্যাগ তৈরি করা যেতে পারে। সিসিক চাইলে বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের মাধ্যমে এই ব্যাগ তৈরি করিয়ে পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান বা সার্ভিস সেন্টারে সুলভ মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করতে পারে। পরবর্তীতে সাধারণ পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যাগে ময়লা ফেলা নিষিদ্ধ করে জরিমানার বিধান চালু করলে নাগরিকরা বাধ্য হয়েই এই পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করবেন। এর ফলে একদিকে সিসিকের বাজেটের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অভ্যাসেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বর্জ্যমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে সিসিক কর্তৃপক্ষ সবশেষে সকল নাগরিককে সচেতন হওয়ার এবং যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলে নির্ধারিত ব্যাগে বা স্থানে বর্জ্য জমা করার জোর আহ্বান জানিয়েছে।
সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) একলিম আবদীন বলেন, “এর আগে ২০২৪ সালে স্বপ্ল পরসিরে কিছু ব্যগ পরীক্ষামূলকভাবে বিতরণ করা হয়। তবে এ বছর ব্যাপকভাবে সফলতার সহিত ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। ”
তিনি আর বলেন, “কোরবানিকে ঘিরে সিসিক ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। ঈদের আগে প্রতিটি ওয়ার্ডে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার জন্য একটি হটলাইন নম্বর চালু রয়েছে। যেহেতু অনেকেই দেরিতে কোরবানি দিচ্ছেন এবং ঈদের পরদিনও কোরবানি হবে, তাই আমাদের কর্মীরা সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবেন। আমরা আশা করছি, প্রথম দফার সিংহভাগ বর্জ্য আজ বিকেল ৫টার মধ্যেই অপসারণ সম্পন্ন হবে।





