সিলেটে চামড়া সংগ্রহ লক্ষাধিক: অসন্তোষ দামে ও দুশ্চিন্তা পাওনায়
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ জুন ২০২৬, ৩:০০:২৬ অপরাহ্ন

মামুন পারভেজ: সিলেটে কোরবানির ঈদে লক্ষাধিক পশুর চামড়া সংগ্রহ হলেও দাম ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তৃণমূল পর্যায়ে কোথাও নামমাত্র মূল্যে, কোথাও আবার বিনামূল্যেই চামড়া হাতবদল হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর ধরে বকেয়া পাওনা আদায় না হওয়া এবং এবারও কাক্সিক্ষত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
শাহজালাল চামড়া ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার সিলেট মহানগর ও জেলার ১৩টি উপজেলায় অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে গরুর চামড়া ৯০ হাজার এবং খাসি-ছাগলের চামড়া ২২ হাজার। সংগৃহিত চামড়াগুলো লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ১০ থেকে ১২ দিন পর এসব চামড়া ট্যানারি বা বড় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হবে।
তবে চামড়া সংগ্রহ করলেও ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে বিক্রয়মূল্য। ব্যবসায়ীরা জানান, গরুর চামড়া আকার ও মানভেদে ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় সংগ্রহ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি গরুর চামড়ার জন্য ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্যানারি মালিকরা কী দামে চামড়া কিনবেন, আদৌ কিনবেন কি না-তা নিয়েই রয়েছে অনিশ্চয়তা। বকেয়া টাকার মধ্যে চলতি বছর অর্থাৎ গত কোরবানি ঈদের পাওনা টাকার মাত্র ২০ শতাংশ পরিশোধ করেছে কমিশন এজেন্টরা।
এ বছর সরকার নির্ধারিত দামের ধারে-কাছেও বিক্রি হয়নি অধিকাংশ চামড়া। ফলে অনেক কোরবানিদাতা চামড়া বিক্রির পরিবর্তে মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করেছেন। কেউ কেউ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। নগরীর পাঠানটুলার বাসিন্দা ফয়সল আহমদ জানান, বাজার পরিস্থিতি ভালো না থাকায় তিনি তার পশুর চামড়া শাহ জালাল রহ. দরগাহ মাদরাসায় দান করেছেন। একইভাবে বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রহিম শেখ বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করলে ২০০ টাকাও পাওয়া যেত না, তাই তিনি স্থানীয় একটি মাদরাসায় চামড়া দিয়ে দিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহের পরিস্থিতিও ছিল হতাশাজনক। ব্যবসায়ীরা জানান, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটসহ কয়েকটি উপজেলায় অনেক মানুষ উপযুক্ত দাম না পেয়ে চামড়া বিনামূল্যে দিয়ে দিয়েছেন অথবা খুব কম মূল্যে বিক্রি করেছেন। কোথাও কোথাও চামড়া ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। যদিও ব্যবসায়ীদের দাবি, বিক্রিতে বিলম্ব হওয়ায় কিছু চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছে।
চামড়া সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কওমি মাদরাসাগুলো। ঈদের আগে তারা চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে সরকারের উদ্যোগ ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নেয়। সিলেটের প্রায় ৫২টি মাদরাসা ও এতিম খানা ৪০ হাজার পিসের মতো চামড়া সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মূলত এসব মাদরাসা ও এতিমখানা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন।
কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম সদস্য সচিব মুফতি রশিদ আহমদ বলেন, ‘এবার ৫২টি মাদরাসা সংগৃহিত ৪০ হাজার চামড়া বিক্রি করতে পেরেছি। প্রশাসন যথেষ্ট আন্তরিক ছিল। চামড়া সংগ্রহে মাদরাসাগুলোর যে ব্যয় হয়েছে তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। চামড়ার দাম ২শ থেকে আড়াইশ উপরে উঠে না।’
এদিকে, কওমি মাদরাসার বড় একটি অংশ এবার চামড়া সংগ্রহে অংশ নেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব মাওলানা মুশতাক আহমদ খান জানান, তারা এবছর চামড়া সংগ্রহ করেননি। এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই।
শাহজালাল চামড়া ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সদস্য মো. শাহজাহান বলেন, ‘সংগ্রহ করা অধিকাংশ চামড়ায় ইতোমধ্যে লবণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম ধাপের সংরক্ষণের কাজ শেষ। লবণের কোনো সংকট নেই। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় লবণ সরবরাহ করা হয়েছে। কোরবানির ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিতে পারলে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়। বাজারে চামড়ার দাম নির্ধারিত হয় মান, আকার ও গুণগত অবস্থার ভিত্তিতে। বর্তমানে বড়, মাঝারি ও ছোট চামড়া আলাদাভাবে শ্রেণিবিন্যাস করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় এবছর আশানুরূপ চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। কিন্তু এ চামড়া বিক্রি করতে না পারলে আমরা বিপদে পড়ে যাবো। আমাদের বকেয়া টাকাও পুরোপুরি ফেরত দেয়নি কমিশন এজেন্টরা। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, সিন্ডিকেট ভেঙে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।’
নগরের বিভিন্ন স্থানে চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুফতি রশিদ আহমদ বলেন, আগে একটা সময়ে সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করতেন। এখন আর তা হচ্ছে না। তাই অনেকেই কাঁচা চামড়া দেরিতে নিয়ে আসায় তা নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের সংগৃহিত প্রায় আড়াই হাজর পিস চামড়া নষ্ট হয়েছে।
এ বিষয়ে মো. শাহজাহান বলেন, ‘বাছাইয়ের পর নষ্ট চামড়া ফেলে দেওয়া হয়। এসব ভিডিও করে অনেকেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেটে চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ আশাব্যঞ্জক হলেও প্রকৃত সংকট এখন বাজারজাতকরণে। ট্যানারি মালিকদের কাছে আগের বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। ফলে ঈদের পর চামড়ার বাজারে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ধূ¤্রজাল, যার সমাধান নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের বাজার পরিস্থিতি ও ট্যানারি মালিকদের ক্রয় সিদ্ধান্তের ওপর।





