শাহজালাল-শাহপরান মাজারের হিসেব চাইলো জেলা প্রশাসন
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ জুন ২০২৬, ৮:৫৭:২৬ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসেবে চেয়েছে জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার (১২ জুন) বেলা দেড়টার দিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিদর্শন করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।
পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারকে কেন্দ্র করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মাজার দুটিকে আধুনিক ও নান্দনিক ইসলামী কমপ্লেক্সে রূপান্তরের পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসম্মুখে উন্মুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সিলেটে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম ।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘সিলেটের দুটি বড় ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজার। আমরা এই দুই মাজারকে কেন্দ্র করে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় এনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য মাজারের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে আমরা এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাজারের ব্যবস্থাপনা, কার্যক্রম এবং সার্বিক পরিবেশকে একটি নির্দিষ্ট মানদ-ের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিষয় এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মাজারে প্রশাসক নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে কি- না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মাজারকে একটি আধুনিক ও সুন্দর ইসলামী কমপ্লেক্সে রূপান্তর করা এবং একই সাথে মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাবটা করা। এই হিসাবটি যেন স্বচ্ছ হয় সেই বিষয়ে নজর দেওয়া। অন্যদিকে মাজারের আয়-ব্যায়ের হিসাব যেন জনসম্মুখে রাখা হয়। যাতে সাধারণ জনগন যেন দেখতে ও বুঝতে পারেন মাজারের আয়-ব্যায়ের টাকাটা কোথায় কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে। আর তাকে জনসাধারণ যাতে তাদের মতামত দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। এখন থেকে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হবে।’
মাজার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতিনিধিদেরও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, মাজার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতিনিধিরাও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। প্রতিদিন কত টাকা আয় হচ্ছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং আর্থিক লেনদেনের সকল তথ্য যথাযথভাবে রেকর্ড ও সংরক্ষণ করা হবে। শাহজালাল (রহ.) মাজার ও শাহপরাণ (রহ.) মাজারের সার্বিক কার্যক্রমের ওপর সরকারের নিয়মিত নজরদারি ও তদারকি অব্যাহত থাকবে।’
জানা যায়, এসব মাজারে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসেন ভক্তরা। কেউ প্রার্থনা নিয়ে, কেউ মানত নিয়ে। সেই সঙ্গে দান করেন অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু ও নানা মূল্যবান সামগ্রী।
কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে জমে ওঠা দানের অর্থের হিসাব থেকে গেছে আড়ালেই। দীর্ঘদিন পর অবশেষে মাজারের আয়ব্যয়ের হিসেবে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর সিলেটের ঐতিহাসিক দরগাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সভায় মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্পষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সিলেট জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।
এই দুই মাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মানত, দান ও নজরানা প্রদান করেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু, খাদ্যসামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের দানও জমা পড়ে মাজারে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার দান আসে এসব মাজারে। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে পরিচালিত হয়, কোথায় ব্যয় করা হয় কিংবা কত টাকা আয় হচ্ছে; এসব বিষয়ে কখনোই জনসম্মুখে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
২০০৩ সালে শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে দরগাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। সে সময় সংবাদমাধ্যমে মাজারের বিপুল আয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন মাজার কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, মাজারের দানের অর্থের একটি অংশ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীদের ব্যয়ে ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট অর্থ মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়।
কিন্তু সেই ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত ও জনসম্মুখে উপস্থাপিত হিসাব কখনো দেখা যায়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল ছিল।
গত বুধবার সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিলেট সিটি করপোরেশন, ওয়াক্ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মাজার ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় দরগাহ দুটির বর্তমান আয়-ব্যয়, দান-অনুদান, প্রশাসনিক কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন কমিটির পক্ষ থেকে সুসংগঠিত আর্থিক রেকর্ড ও নির্ভরযোগ্য হিসাবপত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাবপত্র চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলেও জানা গেছে।
সভায় বক্তারা বলেন, শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সিলেটবাসীর ঐতিহ্য, ইতিহাস ও গৌরবের অংশ। তাই এর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
এসময় বক্তরা আরও উল্লেখ করেন, এসব দরগাহ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বরং এটি সমগ্র সিলেটবাসীর সম্পদ। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিচালনা করা জরুরি।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় পরিচালনা এবং নিয়মিত অডিটের বিষয়েও মতামত দেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব। তিনি বলেন, ‘মাজারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এতে ভক্তদের আস্থা আরও বাড়বে এবং দানের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম আয় ব্যয়ের হিসাব বিষয়ে জানান, মাজারগুলোর আয় ব্যয়ের মধ্যে কোনো সচ্ছতা নেই। ওদের কাছে কোনো হিসাব নেই। তিনি বলেন, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াক্ফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই সময়ের মধ্যে আয়-ব্যয়ের সঠিক চিত্র, দানের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।
অন্যদিকে প্রশাসনের এই উদ্যোগে কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন মাজার কর্তৃপক্ষ। শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, প্রশাসন কেন হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট ধারণা পাননি। সভায় অংশগ্রহণের জন্যও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। আমাদের কথাও শোনতে রাজি হননি জেলা প্রশাসক। আমরা এটা কিভাবে পেলাম এটাও শোনতে রাজি নন। আমাদের একটা কোর্টের রায় আছে। একটা মামলাও চলমান আছে। কিন্তু তিনি আমাদেরকে কথা বলারও সুযোগ দেন নি। আমরা অসহায় হয়ে বসে আছি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবপত্র রয়েছে, তবে সেগুলো উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাইনি। তাই কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। তবে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’





