শিক্ষার্থীদের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:৪৬:১০ অপরাহ্ন
সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ওপর এআই অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এআই ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে এই গবেষণার ফলাফলে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে দ্রুত হোমওয়ার্ক শেষ করছে শিক্ষার্থীরা। বাড়ছে হোমওয়ার্কের নম্বরও। তবে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর ১৮ শতাংশ বাড়লেও ৬ মাসের মধ্যে মাসিক পরীক্ষায় তাদের ফল কমেছে ২০ শতাংশ। এতে দ্রুত কাজ শেষ করার সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
উল্লেখ্য, বিশে^র বিভিন্ন দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। চীনে বছরে অন্তত: ৮ ঘণ্টা এআই বিষয়ে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদীআরব ও কাতারও তাদের পাঠ্যক্রমে এআই যুক্ত করতে শুরু করেছে। এআই চ্যাটবট শিক্ষার্থীদের শেখার কাজকে সহজ ও দ্রুত করতে পারে। কোন বিষয়ে বুঝতে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়। তবে শিক্ষার্থীরা যখন এআইয়ের সাহায্য ছাড়া পরীক্ষায় বসে, তখন তাদের অর্জিত জ্ঞানের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। ফলে প্রশ্ন ওঠেছে এআইয়ের মাধ্যমে করা কাজের কতোটা শিক্ষার্থীরা নিজে শিখছে এবং কতোটা প্রযুক্তির মধ্যেই থেকে যাচ্ছে।
শিক্ষায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বড় পরিসরে একটি গবেষণা করেছেন স্টকহোম বিশ^বিদ্যালয়ের ভিক্টর লেই ও ইয়ানপুই উ। চীনের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে ৩০ মাস ধরে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় হোমওয়ার্কের তথ্যের পাশাপাশি মাসিক বই না দেখে দেওয়া পরীক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষার ফলও বিশ্লেষণ করা হয়। মোট ৯টি বিষয়ের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। গবেষণায় স্কুলের কাজ করা এবং সেই কাজ থেকে প্রকৃতপক্ষে শেখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, গবেষণায় এআই ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণার ফল এআইয়ের ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের কাজ দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করলেও, সেই কাজ তারা কতোটা জ্ঞান অর্জন করছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সর্বোপরি, শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব একেবারে নেতিবাচক নয়। এটি শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচাতে পারে। কঠিন বিষয় বুঝতে সহায়তা করতে পারে। তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাহায্য করতে পারে। তবে শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো কাজ করে দেওয়ার বদলে শেখার সহায়ক হিসেবে এআই ব্যবহার করাই বেশী কার্যকর হতে পারে। কারণ হোমওয়ার্ক দ্রুত শেষ করার সুবিধার আড়ালে যদি শিক্ষার্থীর নিজের শেখার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে পরীক্ষায় তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর নিজস্ব শেখার সক্ষমতা ধরে রাখা।
এদিকে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন বিদ্যমান। বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, বর্তমান যুগে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য এআই অত্যন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, এদেশের শিক্ষার্থীরা ক্লাসের কঠিন পড়া বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো চ্যাটবট দিয়ে সহজ বাংলায় বা নিজেদের মতো করে বুঝে নিতে সক্ষম। কিছু এআই টুল প্রাইভেট শিক্ষকের মতো সাহায্য করতে পারে এবং ইংরেজী লেখার ভুল শুধরে দিতে পারে। এছাড়া প্রযুক্তি নির্ভর এই বিশে^ ফ্রি ল্যান্সিং, প্রোগ্রামিং বা আধুনিক কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে এআই টুল ব্যবহারের প্রাথমিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তবে বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত: প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। এখনো অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল। এছাড়া শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য অনেক বেশী। সচেতনতার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে। অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এখনো এআইয়ের সঠিক ব্যবহার জানেন না। এই বাধাগুলো দূর না করলে এআইয়ের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হচ্ছে, এআই ব্যবহার করুন, কিন্তু তা করুন সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে। এআই তথ্য দিতে পারে। তবে গবেষণার মৌলিক চিন্তা নিজেকেই করতে হবে। গুগল, স্কলার, মেন্ডেলি, জোটেরা ইত্যাদি টুলসের নিয়মিত ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এগুলো গবেষণাকে সহজ ও কার্যকর করে। সবচেয়ে জরুরী হলো, নৈতিকতা বজায় রাখা। এআই যেনো সহায়ক হয়, বিকল্প নয়, বিষয়টি মনে রাখতে হবে।






