ভয়ংকর দৃষ্টান্ত!
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুলাই ২০২৩, ১২:৩০:৪৫ অপরাহ্ন

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘৪১ লাখ টাকার অনিয়ম: দোষী প্রমাণিত যুগ্ম সচিবকে মামলা থেকে অব্যাহতি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলেও বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে যুগ্ম সচিব আলতাফ হোসেনকে। গত ২৯ জুন অবসরে যাওয়া প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তাকে ৪১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা অনিয়মের জন্য লঘুদন্ড দিতে সুপারিশ করেছিলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে রাষ্ট্রপতি তাকে মামলা থেকেই রেহাই দেন।
জানা গেছে, আলতাফ হোসেন সর্বশেষ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমী প্রতিষ্ঠাকরণ (আইডিয়া) প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন। ২০১৯ থেকে ২ বছর ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ ইমার্জেন্সী মাল্টি সেক্টর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স (ইএমআরসিআর) প্রকল্পের পরিচালক। বিশ্বব্যাংকের ১৬৫ মিলিয়ন ডলার অনুদানের একটি প্রকল্পের আওতায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া কেন্দ্রে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, হাটবাজার, সড়ক, নালাসহ বিভিন্ন নির্মাণ করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এ প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে আলতাফ হোসেন সরকারী ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) লংঘন করে মালপত্র কেনেন। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মালপত্র কেনার শর্ত ছিলো। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে অর্থাৎ ঠিকাদারের দেয়া মূল্য তালিকা অনুযায়ী ২৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকায় মালপত্র কেনেন। এছাড়া গাড়িভাড়া, গাড়ির ব্যবহার ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো অনিয়মসহ মোট ৪১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।
এক পর্যায়ে গত ২৯ মে দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়মের সন্দেহাতীত প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু চাকুরীজীবীদের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়েছেন বিবেচনায় তাকে লঘুদন্ড হিসেবে তিরস্কার করার সুপারিশ করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দীন চৌধুরী। নিয়ম অনুযায়ী যুগ্ম সচিব ও তদুর্ধ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সাজা দিতে পারেন না সচিব। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি সাজা দিতে পারেন। পরে বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে তিনি তাকে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেন। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও সাজা না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়া ভয়ংকর নজির সৃষ্টি করবে। দুর্নীতিতে জড়াতে অন্য কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করবে।
উপরোক্ত ঘটনাটি বাংলাদেশে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি ক্ষুদ্র ঘটনা মাত্র। এভাবে হাজারো ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত, যেগুলোর কোন হদীসই পাচ্ছেন না কেউ। আর পেলেও এ ধরনের অপরাধ, অপকর্ম ও দুর্নীতির হোতা আমলাদের বিরুদ্ধে ‘টু’ শব্দটি পর্যন্ত কেউ উচ্চারণ করতে পারছেন না। এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট ও পাচার করা হচ্ছে। ঘটনাক্রমে কেউ ধরা পড়লেও সহকর্মী ও সহযোগী উর্ধতন কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় তারা মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে এসব উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি নারীঘটিত কেলেংকারী এমনকি ধর্ষণের মতো অপরাধও সংঘটন করছেন। অপরাধ প্রমানিত হলেও শেষ পর্যন্ত অতিশয় লঘুদন্ড কিংবা সম্পূর্ণ রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে এ ধরনের অপরাধ গ্রাস করেছে দেশের প্রশাসনকে। এসব ঘটনা শুধু দেশের মানুষকেই ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ করছে না বরং বিদেশেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে দেশের উন্নয়ন। অবিলম্বে এসবের অবসান প্রয়োজন।
বলা বাহুল্য, এদেশের প্রশাসনে অতীতেও কমবেশী দুর্নীতি ছিলো, কিন্তু এর মাত্রা এতো ব্যাপক ও গভীর ছিলো না। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতার হিতকামী মহলের দৃষ্টি ও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।




