সীমান্তে নতজানু নীতি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জুন ২০২৪, ১২:৩৫:১২ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) মূল দায়িত্ব হচ্ছে দেশের সীমান্ত রক্ষা। অন্য দেশের আগ্রাসন ও ক্ষতিকর কর্মকান্ড থেকে নিজ দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানও তাদের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এই বর্ডার গার্ড বা সীমান্তরক্ষীরা যখন সীমান্ত এলাকার মানুষকে ভিন্ন দেশের সীমান্তরক্ষীদের হামলার ভয়ে সীমান্ত এলাকায় না যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করে তখন তাদের শক্তি, সাহস ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে প্রশ্ন দেখা দেয়। আর এমন ঘটনাই ঘটেছে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর এলাকায়। গত ১১ জুন এই উপজেলার ৫৮ বিজিবির অধীনস্থ এই বিশেষ ক্যাম্পের পক্ষ থেকে এমন মাইকিং করা হয়।
এই এলাকায় বিজিবি’র পক্ষ থেকে মাইকিং করে বলা হয়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের নিকটবর্তী বাংলাদেশী অসামরিক ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে পারে। তাই বাংলাদেশী জনসাধারণকে সীমান্ত এলাকায় না যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে। জানা যায়, এর আগের দিন রাতে কোন এক সময় ভারত সীমান্তের মধ্যে বিএসএফের এক সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে দুস্কৃতকারীরা। বিএসএফের দাবি, হামলাকারীরা বাংলাদেশী। এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হামলার ঘটনায় ভারতীয় ৩ জন নাগরিকের সরাসরি যুক্ত থাকা এবং বিএসএফ কর্তৃক একজন হামলাকারীকে আটকের পরিচয়সহ বিজিবি’র জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএসএফ সম্মত হয় যে, হামলার ঘটনায় ভারতীয়রাই জড়িত। এতে বাংলাদেশী কাউকে জড়িত পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি এর সীমান্তবর্তী জনগণের জন্য শংকা সৃষ্টিকারী। প্রতিবেশী একটি দেশের সীমান্তরক্ষী কিংবা অন্য কোন বাহিনী অথবা সেদেশের জনগণের উপর কোন হামলা হলে বাংলাদেশকে কেন প্রমাণ করতে হবে যে, হামলাকারীরা বাংলাদেশী নয়। কোন বাংলাদেশী এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকলে আক্রান্ত পক্ষেরই উচিত এ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ প্রদান করা। যাতে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এসবের বিপরীতে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড (বিজিবি)’কে মাইকিং করতে হলো সীমান্তে জনগণকে না যাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনগণ সীমান্ত এলাকায় তাদের গরু ছাগল চরাবে ও ক্ষেতে খামারে কাজ করবে। এতে কারোর বাধা দেয়ার কিংবা এসব কাজ থেকে তাদের বিরত থাকার অধিকার কারো থাকার কথা নয়। কিন্তু কে বা কারা হামলা করেছে, এই অজুহাতে ভারতীয় বিএসএফ বাংলাদেশীদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে গুলি চালাবে, এটা কোনভাবেই সৎ প্রতিবেশী বা বন্ধুসুলভ আচরণ হতে পারে না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিগত কয়েক যুগ ধরে এমনি বেআইনী ও অমানবিক আচরণ করে আসছে বাংলাদেশের গোটা সীমান্তবর্তী এলাকাজুড়ে। সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে বাংলাদেশী মানুষ হত্যা বাংলাদেশ ভারতের সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ও প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে। দু’দেশের জনগণের মাঝে ক্রমবর্ধমান তিক্ততার এটা অন্যতম প্রধান কারণ, এমন অভিমত সচেতন মহলের।
ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে যে অমানবিক আচরণ করে থাকে, তার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে তা করে না বা করতে পারে না। কারণ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। ভারত যদি সীমান্তে কখনো তার প্রতিবেশী দেশের কাউকে গুলি করে হত্যা করে, এমনকি গুলি ছুঁড়ে এর জবাবে প্রতিবেশীরা সাথে সাথে এর প্রতিশোধমূলক পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আর এই ভয় থেকেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা তাদের অন্যায় অপকর্ম থেকে বিরত থাকে। এটা এক ধরনের কাপুরুষতা। এটা ‘শক্তের ভক্ত নরমের যম’ প্রবাদটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের নমনীয়তা তথা দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই যে তারা সীমান্তে এমন নৈরাজ্যকর পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই।




