চিকিৎসা খাতের নাজুক অবস্থা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫:২০ অপরাহ্ন

সম্প্রতি একটি জাতীয় মিডিয়ায় ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেজে চিকিৎসা, অভিযানে বন্ধ হলো চেম্বার’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ভুয়া চিকিৎসক সেজে এই প্রতারণার ঘটনাটি ঘটেছে কুষ্টিয়ায়। এভাবে ভুয়া চিকিৎসকের পরিচয় বা প্রতারণা ফাঁস হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কথা হচ্ছে, এভাবে দেশজুড়ে কতো ভুয়া চিকিৎসক চিকিৎসার নামে মানুষকে আরো অসুস্থ করা এমনকি প্রাণহানি ঘটানোর জঘন্য কর্মে লিপ্ত, তা এখনো অজানা। একজন জালিয়াত বা ভেজালকারী প্রতারক যখন অর্থ ছাড়াও মানুষের স্বাস্থ্য তথা জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করে তখন তাকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করা অবশ্য কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এই দৃষ্টিকোন থেকে ভুয়া চিকিৎসক বা চিকিৎসার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমূহের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরী।
অতীতে এদেশে হাতুড়ে চিকিৎসক নামে একটি শ্রেণি ছিলো। ছিলো ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণবিহীন কবিরাজী চিকিৎসক। এসব চিকিৎসক নামধারীদের হাতে লাখ লাখ মানুষ আর্থিক ও শারীরিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে ক্যানভাসার চিকিৎসকদের বড়ি সালসা ইত্যাদি খেয়ে রোগীদের আরো অধিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনা এদেশে একসময় অহরহ ঘটেছে। তবে বর্তমানে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে মানুষ এদের প্রতারণার ফাঁদে খুব কমই পা দিচ্ছে। অবশ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে এদের তৎপরতা এখনো লক্ষণীয়।
দেখা গেছে, ভুয়া চিকিৎসক ও হাতুড়ে চিকিৎসকের দৌরাত্ম তখনই বাড়ে যখন সাধারণ সীমিত আয়ের ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ নামী দামী চিকিৎসকদের কাছে যেতে পারে না, যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য থাকে না। আর এই সুযোগকে ব্যবহার করে এসব চিকিৎসক নামধারী প্রতারকরা। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব না দেয়, তবে এদের প্রভাব ও তৎপরতা যে বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সর্বোপরি বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও মানহীনতা বিদ্যমান, এতে গরিব রোগীদের ভুয়া ও হাতুড়ে চিকিৎসকের এবং বিত্তবান রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করছে। জানা গেছে, সাম্প্রতিককালে এদেশের রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এটা মূলত চিকিৎসার প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার কারণেই হচ্ছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশী রোগী বেড়েছে ৮ গুণ ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। পরিসংখ্যানটি চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত হয়। এ সংখ্যা ও পরিমান ইতোমধ্যে আরো বেড়েছে বলে ধারণা করা যায়। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাচ্ছে এবং এতে তাদের ব্যয় হচ্ছে প্রায় অর্ধলক্ষ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এসব মানুষ মূলত ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। এর মধ্যে ৯২ শতাংশই যাচ্ছে ভারতে। চিকিৎসা নিতে বিদেশমুখী প্রবণতা থেকে দেশের চিকিৎসার মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অর্ধযুগেরও আগে দেশের একটি শীর্ষ মিডিয়ায় এদেশের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘১৮৮ টি দেশের মধ্যে ১৫১’ শিরোনামে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশি^ক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের র্যাংকিং বা অবস্থান ভালো নয়। ১৮৮ টি দেশের স্বাস্থ্যের ভালো থেকে খারাপ পরিস্থিতির ক্রম তালিকায় বাংলাদেশ ১৫১ তম। তালিকায় মূলত আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়ে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভালো। বিশে^র ১৩০ টি দেশের ১ হাজার ৮৭০ জন বিজ্ঞানী, গবেষক ও গণস্বাস্থ্যবিদ এই বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। কথা হচ্ছে, গত অর্ধযুগে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কি উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে? নাকি পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে আগের তুলনায়? এ ছাড়া দেখা গেছে, এদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য আছেন মাত্র ১২৭ জন চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রী।
সবমিলিয়ে এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনেক আশা ও প্রত্যাশা এবং প্রতিশ্রুতির কথা বললেও এখন তাকে তুলনামূলক নীরব থাকতে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য একজন মন্ত্রী বা কর্মকর্তার পক্ষে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দীর্ঘকালের বিদ্যমান অনিয়ম, অসঙ্গঁতি ও দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশে বাড়ছে ভুয়া চিকিৎসক, রেজিস্ট্রেশনবিহীন ক্লিনিক, প্যাথোলজিক্যাল সেন্টার এবং ফার্মেসী। এসব অনিয়ম ও অসঙ্গতি দূরীকরণে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।




