তুমি আছো হৃদয়ে
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৫, ৮:৩১:৪১ অপরাহ্ন
আহবাব মোস্তফা খান :
তুরাবকে নিয়ে যখন লিখতে বসলাম, দিনটি শুক্রবার। তুরাব যেদিন পৃথিবীর ওপারে চলে গেলো, সেদিনও ছিলো শুক্রবার।
সেদিনও সবাই যে যার মতো জুমআ’র নামায আদায় করে ফিরছিলেন আপন নীড়ে। কিন্তু তুরাব? না তুরাব ফিরেনি ঘরে। সাংবাদিকতার মোহমায়া তাকে জুমআ’ থেকে সরাসরি নিয়ে গেলো অগ্নিগর্ভ ময়দানে। জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চললো তাঁর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ।
জুমআ’র পর যখন দুপুরের আহারের ব্যস্ততা, ঠিক তখন খবর এলো পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার এটিএম তুরাব। সেদিন শ্রাবণের আকাশে মেঘ ছিলো না। কিন্তু কে জানতো আকাশে মেঘ না থাকলেও সিলেটের সাংবাদিকতার আকাশে কালো মেঘ ভর করেছে। তারুণ্যের আলোয় উদ্ভাসিত সাংবাদিক তুরাবের শরীরে ৯৮টি গুলি ভেদ করেছে। শরীরে প্রেস লেখা জ্যাকেটও পুলিশের নির্মমতা থেকে তাকে রেহাই দেয়নি।
তাকে নেয়া হলো হাসপাতালে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। গোধুলী লগ্নে যখন ডুবতে লাগলো সূর্য, তখনই জানা গেলো ডুবে গেছে সিলেটের সাংবাদিকতার এক তারুণ্য। বুলেটের কাছে মাত্র ৩৪-এ থেমে গেছে তুরাবের স্বপ্নযাত্রা। মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার সরলতা, অফিসের পাশের চেয়ার থেকে ‘ভাই’ বলে ডাকা কতশত স্মৃতি। বিষন্ন কষ্ট আর এক সমুদ্র হতাশা ভর করলো হৃদয়ের গহীনে। বিশ্বাসই হচ্ছিলো না, তুরাব নেই। মৃত্যুর এক বছরেও বিশ্বাস হয়না। মনে হয়, এইতো তুরাব কল দিয়ে বলছে, ভাই আজ এই আইটেম (বিশেষ সংবাদ) দিমু।
মনে পড়লো মানবতাবাদি কবি জন ডানের সেই অমর উক্তিটির কথা- ‘প্রত্যেক মৃত্যুই আমাকে আহত করে। কিন্তু অপূর্ণ বয়সের মৃতু্য (যদিও মৃত্যুর কোন পূর্ণ বয়স নেই) আমাকে শুধু আহতই করেনা, আমার হৃদয়কে ক্ষত বিক্ষত করে দেয়’। তুরাব নেই-কথাটা শুনার পর যেন আমার হৃদয়টাও ক্ষতবিক্ষত হলো।
হৃদয়ের গহিনে উচ্চারিত হলো তারাশঙ্করের উক্তিটির কথাও। ‘জীবন কেন এত ছোট’!
অথচ মাত্র ক’দিন আগে নতুন স্বপ্নের মালা গাঁথলো তুরাব। ব্রিটিশ তরুণীর সাথে জীবনের মিতালী গড়লো। অশীতিপর মা ও ভাই-বোনদের স্বপ্নপূরণের শূভ সূচনা করলো। বিয়েতে সবার কাছে নিজের অনাগত আগামীর জন্য দোয়া চাইল তাঁর সেই সহজ-সরল ভঙ্গিমায়। কিন্তু সবই শেষ করে দিলো অপেশাদার পুলিশের ‘পেশাদার কিলিং’।
তুরাবের চলে যাওয়ার পর মায়ের আহাজারী দেখেছি। যেন আসমান কাঁপে। বেশ কিছুদিন পর নববিবাহিতা স্ত্রীও শোকাহত হৃদয় নিয়ে এসছিলেন দৈনিক জালালাবাদ অফিসে। তুরাব কোন চেয়ারে বসতো সেটি তিনি দেখতে চান। শুধু দেখেননি, বেশ কিছুক্ষণ চেয়ারে বসে অশ্রু ফেলেছেন অবিরত। চেয়ারের মাঝেই তুরাবকে খুঁজছিলেন তিনি। সেদিন তুরাবের প্রতি তাঁর ভালোবাসার বিশালতা ও বুকফাটা কান্না কাঁদিয়েছে গোটা অফিসকেই। বুঝতে বাকি রইলো না, মাত্র ক’দিনেই নব পরিণিতা ব্রিটিশ বধুর হৃদয়কেও জয় করে ফেলেছে তুরাব। কাগজে নয়, পাথরেও নয়, তুরাবকে হৃদয়েই লিখে রেখেছেন বোন তানিয়া।
এটাই তুরাবের বৈশিষ্ট্য। যে কাউকেই মুহূর্তেই আপন করে নিতে পারে। প্রায় সাত বছর পাশের চেয়ারে কাজ করেছে। সুসময়ে-দু:সময়ে সবারই আপনজন ছিলো সে। চঞ্চলতা আর খুনঁসুটিতে মাতিয়ে রাখতো অফিস। পোশাক-আশাকে ছিলো মার্জিত। চলাফেরায় ছিলো স্মার্ট। পেশাদারিত্বে সে ছিলো অন্য সবার চেয়ে আলাদা। ঝুঁকি নিতে চাইতো সবসময়ই। ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে ছিলো ভয়-ডরহীন। আর এটাই হয়তো কাল হলো তাঁর।
আজ প্রিয় ছোট ভাই, অনুজপ্রতিম সহকর্মী তুরাবের চল যাওয়ার এক বছর। এই এক বছরে তাঁর বিচারের দাবি উঠেছে অন্তত: হাজার বার। ফেসবুকে ঘুরে-ফিরে আসছে তাঁর সেই ক্ষতবিক্ষত ছবি। বন্ধু-পরিজনরাও তাকে নিয়ে করছেন স্মৃতিচারণ। এই সময়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে, তুরাব হত্যার বিচার এগুলো কতদূর?
আমার কাছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট’ (সিপিজে) এর একটি প্রশ্ন ছিলো, ‘এটি কী টার্গেটেড কিলিং’? হয়তো তাই, হয়তো না। কিন্তু পুলিশের ‘রেকলেস’ গুলি তো সে প্রশ্ন উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই। তবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেরার করার দায়িত্বও তো সেই পুলিশের। তারা কি খুঁজে বের করবেন সেই উত্তর?






