অযত্ন অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হলো জকিগঞ্জের গায়েবি দীঘি মসজিদ!
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ৬:১৯:৪৭ অপরাহ্ন

এখলাছুর রহমান, জকিগঞ্জ প্রতিনিধি: গায়েবী দীঘি মসজিদ বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বারঠাকুরী ইউনিয়নে অবস্থিত একটি অতি প্রাচীন মসজিদ। এটি বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নথিভূক্ত একটি স্থাপনা। মসজিদটিতে প্রায় ৪০০ বছরের পুরাতন একটি পাথরের শিলালিপি পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরে সংরক্ষিত। শিলালিপি থেকে ধারণা করা হয়, এটি ১৬শ শতকে নির্মিত হয়েছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে এই মসজিদের কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। স্থানীয় জনসাধারণের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ঐতিহাসিক এই মসজিদটি যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বিলীন হয়ে গেছে। মসজিদটির স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এর ভগ্নাংশ এলাকাবাসী মাটি চাপা দিয়ে রেখেছেন। বারঠাকুরি ইউপি চেয়ারম্যান টিপু চৌধুরী বলেন, মসজিদটি নির্মাণের সময় এটির গায়ে উন্নতমানের প্রলেপহীন পোড়া ইট কেটে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল। দেয়ালের বাইরের অংশে পোড়া ইটের ওপর বিভিন্ন নকশা ও অলঙ্করণ মুসল্লি ও দর্শনার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। মসজিদটি লাল বা রক্তিম রঙের হওয়ায় অনেকে এটিকে ‘লাল মসজিদ’ বলেও উল্লেখ করতেন। প্রতিদিন জেলা শহরসহ আশপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ এখানে ভিড় জমাতো। অনেককে জিকির ও মোনাজাত করতেও আসতে দেখা যেত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই মসজিদটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাটির নিচে পুঁতে রাখা সামান্য ধ্বংসাবশেষ ছাড়া এখন এই মসজিদটির কোনো অস্তিত্বই দেখতে পাওয়া যায় না।
জানা যায়, মসজিদটি ১৫১৩ সালে শাহ মজলিশ আমিন দ্বারা নির্মিত হয়। পরে মসজিদের সুদৃশ্য ইমারত বা ভবন নির্মাণ করা হয় সুলতান আলাউদ্দিন হোসাইন শাহের আমলে। ইমারতটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল একই মাপের, প্রায় ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি। বারান্দার দৈর্ঘ্য ছিল তিন ফুটের সামান্য বেশি। মসজিদটি ‘চার গম্বুজ মসজিদ’ হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত ছিল। কারণ মসজিদের মূল ভবনের ওপর বড় একটি এবং বারান্দার ওপর তিনটি ছোট গম্বুজ ছিল। দরজা ও জানালা ছিল প্রায় ১৫টি- যা ছিল একই আকৃতির। তিন দিকের পুরুত্ব ছিল প্রায় ৫ ফুট, পশ্চিম দিকের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ১০ ফুট। এছাড়া প্রধান কক্ষের চার কোণে ও বারান্দার দুই কোণে মোট ছয়টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভ ছিল। উপরের ছাদ ও প্রধান প্রাচীরের কার্নিশ বাঁকানোভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, বিলুপ্তপ্রায় এই মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি বড় দীঘি রয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভাবগাম্ভীর্যকে আরো বৃদ্ধি করেছে। আজো ধর্মীয় বিশেষ দিনগুলোতে এখানে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
সাবেক ইউপি সদস্য ইয়াকুব আলী বলেন, এই গায়েবি মসজিদ এলাকা ধর্মপ্রাণ মানুষের নিকট একটি পবিত্র স্থান। মসজিদটির হাফ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে অবস্থিত মরমী কবি শাহ শিতালংশাহ এর মাজার। দেড় কিলোমিটার এরিয়ার মধ্যে অবস্থিত বিখ্যাত তিন নদীর মোহনা। দেশের অন্য কোথাও একসাথে একই জায়গায় তিনটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে কি-না জানি না। সে তুলনায় এই এলাকার সৌন্দর্য বর্ধনের প্রয়াস নিতান্তই কম।
আহসান হাবীব নামক এক যুবক বলেন, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শত শত বছরের পুরোনো এই মসজিদটির ঐতিহ্য আজ হারানোর পথে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থানীয় ইতিহাসের দিক থেকে গায়েবী দীঘি মসজিদ একটি অনন্য নিদর্শন, যা সংরক্ষণ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।





