বহুমুখি সংকটে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চিকিৎসা সেবা ব্যাহত
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ৭:১৪:০৫ অপরাহ্ন

শান্তিগঞ্জ প্রতিনিধি: ফুটবল খেলতে গিয়ে ডান হাতের বাহুতে গুরুতর আঘাত পান শান্তিগঞ্জের পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বড়মোহা এলাকার কিশোর ফাহিম মিয়া (১৪)। চিকিৎসা সেবা পেতে ফাহিম মায়ের সাথে আসেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আঘাত গুরুতর অনুধাবন করে কর্তব্যরত চিকিৎসক আঘাতপ্রাপ্ত জায়গা এক্স-রে করার পরামর্শ দেন। এক্স-রে রিপোর্ট দেখেই দেওয়া হবে চিকিৎসা সেবা বা পরামর্শ। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিন না থাকায় বাধ্য হয়েই সুনামগঞ্জ যেতে হয় তাদের। এতে করে একদিকে যেমন চিকিৎসা সেবা পেতে বিলম্ব হচ্ছে তেমনি বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে তাদের। শুধু ফাহিম মিয়াই নয় এক্স-রে মেশিনের অভাবে প্রতিদিন এমন অসংখ্য রোগীকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া ওষুধের ঘাটতি, চিকিৎসকসহ পর্যাপ্ত জনবল সংকট, অস্ত্রোপচারে বিশেষজ্ঞ সার্জন না থাকায় অপারেশন থিয়েটার চালু না হওয়াসহ বহুমুখী সংকট রয়েছে হাসপাতালটিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আর এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশই ঘটছে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আশপাশের এলাকায়। সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের পাশ ঘেঁষার কারণে দুর্ঘটনায় কবলিত হতাহতদের উদ্ধার করে পাঠানো হয় এই চিকিৎসাকেন্দ্রে। এসব রোগীদের প্রথমেই পাঠানো হয় জরুরী বিভাগে। তবে জরুরী বিভাগে প্রতিনিয়ত দুইজন মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট থাকার কথা থাকলেও তাতে সংকট রয়েছে। এছাড়া অস্ত্রোপচারে বিশেষজ্ঞ সার্জন না থাকায় হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। নেই পরীক্ষার জন্য এক্স-রে মেশিনও। ফলে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে আসা রোগীদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রদান না করেই পাঠাতে হচ্ছে জেলা সদর কিংবা বিভাগীয় হাসপাতালে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন রোগীরা। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা অন্যদিকে দুরবর্তী হাসাপাতালে যাওয়ায় বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়। হচ্ছে আর্থিক ক্ষতিও।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে সুনামগঞ্জের ৩১ শয্যাবিশিষ্ট জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএসআর বাজেট ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর বিপরীতে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএসআর বাজেটের বরাদ্দের পরিমান ছিল মাত্র ৫০ লক্ষ টাকা। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই স্বল্প। স্বল্প এই বরাদ্দ দিয়েই ওষুধ সরবরাহসহ সকল চাহিদা পুরণ করতে হয় হাসপাতালটির। ফলে স্বল্প বরাদ্দে অধিক চাহিদা পুরণ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এছাড়া উপজেলার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রটিতে প্রতিদিন দুই থেকে তিন শতাধিক রোগী সেবা নিতে এলেও এর বিপরীতে আছেন মাত্র ৫ জন চিকিৎসক। ফলে বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হাসান বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে বার্ষিক এমএসআর বাজেটের পরিমান পার্শ্ববর্তী হাসপাতালগুলোর তুলনায় খুবই স্বল্প। এই স্বল্প বাজেটে পর্যাপ্ত ওষুধসহ অন্যান্য সেবা দেওয়া খুবই কঠিন। এতে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র শেষ হয়ে যায়। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। অধিদপ্তর থেকে আমাকে জানানো হয়েছে ডিসেম্বর পরে অতিরিক্ত বাজেট দেওয়া হবে।
চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের এখানে ৪ জন মেডিকেল অফিসার আছেন এবং আরএমও দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়েছিলেন কিন্তু টানা দুই মাস ধরে তিনি অনুপস্থিত। সম্প্রতি ৪৮ তম বিসিএসের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি আশা করছি শীঘ্রই সেখান থেকে আমরা চিকিৎসক পাবো। এতে সেবার মান আরো বাড়বে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন শরীফি বলেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একটি নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র। এসব হাসপাতালে বরাদ্দ দেওয়া হয় রোগীর পরিমান অনুযায়ী। নতুন হাসপাতাল হওয়ায় গত বছর মাত্র ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ বছর সেটা বেড়ে ৫০ লাখ হয়েছে। এভাবে রোগী বাড়ার সাথে সাথে বরাদ্দও বাড়ানো হবে। এসব স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর এক্স-রে মেশিন শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে। সেটাও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো হয়। তবে এখন এই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমরা এক্স-রে মেশিন পাচ্ছি না। তবে আগামী বছরের শুরুর দিকে সেটাও পেয়ে যাবো আশা করছি।’
চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট জাতীয় সমস্যা। সারা দেশেই এই সমস্যা রয়েছে। আমরা আমাদের চাহিদা পাঠিয়ে দিয়েছি। আগামী বছর নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। সেখান থেকে আশা করছি আমরাও আমাদের চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক পাবো।





