হঠাৎ বাংলাদেশ-ভারত উত্তাপ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩০:৪১ অপরাহ্ন
ভারতের নসিহত অগ্রহণযোগ্য : বললেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

জালালাবাদ রিপোর্ট : বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনীতিতে হঠাৎ উত্তাপ লেগেছে। গত রোববার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছিলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর রেশ ধরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে গতকাল তলব করেছে। শুধু তাই নয়, হঠাৎ করে কোন রাখঢাক ছাড়াই ঢাকার ভিসা সেন্টারও বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। এর আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশ একাধিকবার ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ভারত এখনো সাড়া দেয়নি।
ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের দ্রুত অবসান চায় ঢাকা। গত রোববার সকালে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে এই বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেদিন সকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রণয় ভার্মাকে তলব করেন। এ সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত উসকানিমূলক বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের গভীর উদ্বেগের বিষয়টি প্রণয় ভার্মাকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
‘জুলাই ঐক্য’র ‘মার্চ টু হাইকমিশন’ কর্মসূচি :
হাসিনাসহ জুলাই গণহত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া ও ভারতীয় প্রক্সি রাজনৈতিক দল, মিডিয়া লীগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ‘মার্চ টু হাইকমিশন’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
বুধবার বিকাল ৩টার পর থেকে রামপুরা ব্রিজে জড়ো হয়েছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করা ঐক্যবদ্ধ মোর্চা ‘জুলাই ঐক্য’। এতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। তবে কর্মসূচীর শুরুতেই বাধা দিয়েছে পুলিশ।
আন্দোলনকারীদের একজন শিহাব জানান, তারা সরকারকে জানান দিতে চান যে দেশের মানুষ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিপক্ষে। তাই তারা মার্চ টু হাইকমিশন কর্মসূচি নিয়েছেন।ঢাকা মহানগর পুলিশের বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আন্দোলনকারীদের হোসেন মার্কেটের সামনে আটকে দেওয়া হয়। সেখানে তারা বক্তব্য দেয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব দিল্লির :
বাংলাদেশ যখন যৌক্তিক কারণে তলব করেছিলো, তখন পাল্টা হিসেবে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ রিয়াজ হামিদুল্লাহ-কে তলব করেছে। এই তলবের ঘটনা ঘটল এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন জুলাই ঐক্য নামের একটি সংগঠন বুধবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়েছে। এই কারণে ঢাকায় কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশে ‘ক্রমশ অবনতির দিকে যাওয়া’ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা হাই কমিশনার হামিদুল্লাহ-কে অবহিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশেষ করে কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, যারা ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় মিশনের চারপাশে নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টির পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে।
ভারত জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার পটভূমিতে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি যে ‘ভ্রান্ত বয়ান’ তৈরি করার চেষ্টা করছে, তা ভারত সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে।বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দুঃখজনকভাবে অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করেনি এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলি সম্পর্কে ভারতের সঙ্গে কোনও অর্থবহ প্রমাণও ভাগ করে নেয়নি।গত বেশ কিছুদিন ধরেই ভারত ও বাংলাদেশ সরকার মধ্যে বিবৃতির যুদ্ধ চলছে, তারা একে অন্যের রাষ্ট্রদূতকেও হামেশাই তলব করে নানা ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা :
ঢাকায় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের কার্যক্রম বুধবার দুপুর ২টা থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র বা আইভ্যাক-এর ওয়েব সাইটে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণে দিনের কার্যক্রম বন্ধ করা হচ্ছে।
গতকাল ভিসা আবেদন জমার স্লট যাদের ছিলো, তাদেরকে পরবর্তী অন্যদিনে স্লট দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ভারতের নসিহত অগ্রহণযোগ্য বললেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা :
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত নসিহত করছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, ভারতের এই অযাচিত নসিহত অগ্রহণযোগ্য। আমরা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এর জন্য প্রতিবেশীদের থেকে কোনো নসিহত গ্রহণের প্রয়োজন নেই।
বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে বসে আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় বক্তব্য দিতেন। এখন তিনি সংবাদমাধ্যমেও বক্তব্য দিচ্ছেন। তার বক্তব্যে যথেষ্ট উসকানি আছে।
আদালতের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে তিনি পাশের দেশে বসে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করবেন-এটাতে তো আমরা আপত্তি জানাবই। আমরা তো তাকে ফেরত চাইবই। কিন্তু ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাচ্ছে না। তার বক্তব্য বন্ধ করছে না। উল্টো সর্বশেষ তারা কিছু নসিহত করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হবে এটা নিয়ে আমরা প্রতিবেশীদের উপদেশ চাই না। এই সরকার অত্যন্ত ভালো পরিবেশে একটি নির্বাচন আয়োজন করতে চায়, যা গত ১৫ বছর ছিল না। এখন ভারত এটা নিয়ে আমাদের উপদেশ দিচ্ছে, এটাকে আমি অগ্রহণযোগ্য মনে করি। কারণ গত প্রহসনের নির্বাচনগুলোতে তারা কোনো শব্দ করেনি।
এখন আমরা যখন একটি ভালো নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি, তখন তারা নসিহত করছে। এটা অগ্রহণযোগ্য।
সম্প্রতি ভারতের সেভেন সিস্টারস নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে না। আমরা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদীকে আমাদের ভূমিতে আমরা আশ্রয় দেব না। একজন রাজনৈতিক নেতা বলতে পারেন। কিন্তু এদেশের কোনো সরকারই এটাকে সমর্থন করবে না।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ভারত সব সময় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ভূমিকাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।





