দুদকের মামলায় কারাগারে সিমেবির ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:১৮:৩৯ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিমেবি) ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন সিলেট মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। গতকাল রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে অভিযুক্তরা আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন মঞ্জুর প্রার্থনা করলে আদালতের বিচারক মুনশী আব্দুল মজিদ জামিন নামঞ্জুর করে তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ দেন। পরে তাদেরকে প্রিজন ভ্যানে করে সিলেট মেট্রোপলিটন কারাগারে পাঠায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগ।
দুদকের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ শফিউল আলম এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী দুদকের মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন আবেদন করেন। আদাললের বিচারক তাঁদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে তাদেরকে সিলেট মেট্রোপলিটন কারাগারে পাঠানো হয়।
আত্মসমর্পণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনাকাটা (প্রকিউরমেন্ট) কর্মকর্তা আব্দুল মুনিম, সেকশন কর্মকর্তা রিঙ্কু দাস, চৌধুরী রুম্মান আহমেদ, লোকমান আহমেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুরঞ্জিত রঞ্জন তালুকদার, মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর রবিউল আলম বকুল ও রুহুল আমিন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. নঈমুল হক চৌধুরী। দুদক স্বপ্রণোদিত হয়ে ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. নঈমুল হক চৌধুরী, সহকারী রেজিস্ট্রার অঞ্জন দেবনাথ, সহকারী পরিচালক শমসের রাসেল, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিলাল আহমদ চৌধুরী, সহকারী পরিচালক সরওয়ার, সেকশন অফিসার মো. বেলাল উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ ও তানভীর আহমদসহ ৫৮জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন দুদকের সিলেটের তৎকালীন ‘বিতর্কিত’ উপ-সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন ইমন। ওই বছরের ২৫ এপ্রিল ৫৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। তাঁদের মধ্যে ১০ জন কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন এবং পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। এ ছাড়া হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে অক্ষম হওয়ায় আবদুস সবুর এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তান থাকায় হালিমা বেগম নামের আরও একজনকে সিলেট মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক জামিন মঞ্জুর করেন। বর্তমানে মোট ১১ জন জামিনে আছেন, ৯ জন কারাগারে। বাকি ৩৮ জন পলাতক রয়েছেন।
মামলার এজহারে আরো বলা হয়, উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সিন্ডিকেট ও ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেন। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২২০ জনকে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে (অ্যাডহক) ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে মেয়াদ অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার পর চাকরি নিয়মিত না করে আবার অ্যাডহকে দুই থেকে পাঁচবার পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।
তবে ভূক্তভোগীরা বলছেন, ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সিন্ডিকেট ও ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পদে নিয়োগ এবং ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২২০ জনকে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে (অ্যাডহক) ৬ মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া এবং পরবর্তীতে সবার নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর যে অভিযোগ দুদক এনেছে, সেটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ দেওয়ার সেই এখতিয়ার রয়েছে। দ্বিতীয়ত দুদক যে মেয়াদ বাড়ানোর যে অভিযোগ এনেছে, সেটা শুধু ৫৬জন নয়, ২৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, সবারই অ্যাডহক মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এই এই ধারায় মামলা হলে ২৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারীই আসমাী হওয়ার কথা, কিন্তু সেটা না করে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার ছাড়া শুধু ৫৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে মামলা দায়ের করে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেছে দুদক, যা এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভূক্তভোগীরা বলছেন, এখানে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। মূলত সরকার থেকে নেওয়া বেতনভাতা ফেরত দিতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। সুতরাং এই ধারায় অপরাধী হলে ২৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সমান অপরাধী। তবে সেই ধারায় অপরাধ হয়ে থাকলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী। এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী কেউ জোর করে বেতন নেননি।
দুদকের এজহারে বলা হয়েছে, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১৮ এর ১২ ধারার উপ-ধারা (১০) উপাচার্য, সিন্ডিকেটের পর্বানুমোদক্রমে, কোনো শূন্যপদে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে অনধিক ৬ (ছয়) মাসের জন্য কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন এবং প্রয়োজনে, উক্তরূপ নিয়োগের মেয়াদ অনূর্ধ্ব ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে পারিবেন। এই ধারা অনুযায়ী ১ বছর এডহক নিয়োগ বৈধ। ১ বছরের বেশি যারা বেতনভাতা নিয়েছেন, তারা রাষ্ট্রের টাকা অপচয় করেছেন। এছাড়া নিয়োগের সময় অনেকের বয়স ৩০ এর বেশি ছিল। যেখানে অনিয়ম হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী ২৪২ জনই ১ বছরের বেশি বেতনভাতা নিয়েছেন। কিন্তু বাকিদের আসামী করা হয়নি। এছাড়া বয়সের বিষয়ে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নিয়োগে বয়সের কোনো উল্লেখ নেই। এখানে আইনের কোনো ব্যতয় ঘটেনি। যে আইন দেখিয়ে দুদক মামলা দায়ের করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম সিন্ডিকেট সভায় এডহক ভিত্তিতে কর্মরত কর্মচারীদের বয়স সংক্রান্ত বিষয় ও অভিজ্ঞতা যোগ হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সেই নিয়োগের বৈধতা দিয়েছে স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অথচ নিরীহ ৫৬জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদেরকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
তারা এও বলছেন, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী ও সাবেক রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে মূলত স্বাক্ষী হিসেবে সবাইকে ডাকা হয়েছে। সেখানে নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে, যদি তদন্তে নিয়োগ বাণিজ্য প্রমাণিত হয়, তাহলে নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত ছিল। সেই ধারায় মামলা না করে বেতনভাতা ফেরত দেওয়ার মামলা করা হয়েছে। এটা মামলার প্রথম অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আনোয়ার হোসেন উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে এই কাজটি করেছেন।
পরবর্তীতে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বদলি হলে মামলার দায়িত্ব পান দুদুকের উপ-সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন ইমন। তিনিও পূর্ববর্তী কর্মকর্তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ৫৮জনকে অভিযুক্ত করেই ফাইনাল চার্জশীট দেন। তাই ন্যায় বিচারের স্বার্থে বিষয়টি অধিকতর তদন্ত হওয়া উচিত, যাতে মূল কোনো নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার না হন। মূলত তৎকালীন উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে বাঁচাতে গণহারে এই চার্জশীট দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।





