দুদকের মামলায় সিমেবির সাবেক রেজিস্ট্রার নঈমুল হক কারাগারে
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:৪৭:৪৯ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগ কেলেঙ্কারীর দায়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালত। গতকাল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) আদালতের বিচারক মুনশী আব্দুল মজিদ তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার দুই নম্বর চার্জশীটভূক্ত আসামী তিনি।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর শফিউল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মঙ্গলবার দুপুরে দুদকের মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন নঈমুল হক। আদালত তার জামিন নাকচ করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। পরে তাকে প্রিজন ভ্যানে করে সিলেট মেট্রোপলিটন কারাগারে পাঠায় সিলেট মেট্রেপলিটন পুলিশের (এসএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগ।
মামলার এজহারে বলা হয়, নঈমুল হক চৌধুরী সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নে পরিচালক (অর্থ) ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। নঈমুল মামলার চার্জশিটভূক্ত ২ নম্বর আসামি। ওই মামলার এক নম্বর আসামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী এখনও পলাতক রয়েছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর বিশ^বিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. নঈমুল হক চৌধুরী। নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দুদক স্বপ্রণোদিত হয়ে ২০২১ সালে বিশ^বিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. নঈমুল হক চৌধুরী ছাড়াও আরও ৫৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন দুদকের সিলেটের উপ-সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসেন ইমন। ওই বছরের ২৫ এপ্রিল ৫৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
মামলার এজহারে আরো বলা হয়, উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সিন্ডিকেট ও ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেন। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২২০ জনকে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে (অ্যাডহক) ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে মেয়াদ অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার পর চাকরি নিয়মিত না করে আবার অ্যাডহকে দুই থেকে পাঁচবার পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।
তবে ভূক্তভোগীরা বলছেন, অ্যাডহক ভিত্তিতে ৬ মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া ও পরবর্তীতে নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর যে অভিযোগ দুদক এনেছে, সেটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিলেট মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সেই এখতিয়ার রয়েছে। দ্বিতীয়ত দুদক যে মেয়াদ বাড়ানোর যে অভিযোগ এনেছে, সেটা শুধু ৫৬জন নয়, ২৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সবারই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এই এই ধারায় মামলা হলে ২৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারীই আসামী হওয়ার কথা, কিন্তু সেটা না করে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার ছাড়া শুধু ৫৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে মামলা দায়ের করে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেছে দুদক, যা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ভূক্তভোগীরা বলছেন, এখানে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। মূলত সরকার থেকে নেওয়া বেতনভাতা ফেরত দিতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। সুতরাং এই ধারায় অপরাধী হলে ২৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সমান অপরাধী। তবে সেই ধারায় অপরাধ হয়ে থাকলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার দায়ী। সেখানে কোনোভাবেই অধিনস্ত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো দায় নেই।
দুদকের এজহারে বলা হয়েছে, সিলেট মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় আইন ২০১৮ এর ১২ ধারার উপ-ধারা (১০) উপাচার্য, সিন্ডিকেটের পর্বানুমোদক্রমে, কোনো শূন্যপদে সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে অনধিক ৬ (ছয়) মাসের জন্য কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন এবং প্রয়োজনে, উক্তরূপ নিয়োগের মেয়াদ অনূর্ধ্ব ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে পারিবেন। এই ধারা অনুযায়ী ১ বছর অ্যাডহক নিয়োগ বৈধ। ১ বছরের বেশি যারা বেতনভাতা নিয়েছেন, তারা রাষ্ট্রের টাকা অপচয় করেছেন। এছাড়া নিয়োগের সময় অনেকের বয়স ৩০ বছরের অধিক ছিল, যেখানে অনিয়ম হয়েছে।
তবে কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে দেখা গেছে, মো. আব্দুল মজিদ নামের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে বয়স সংক্রান্ত যোগ্যতা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে, অথচ নিয়োগের সময় তার বয়স ৩০ বছরের নিচেই ছিল, যা সরকারি কর্মচারী নিয়োগের বিধির লঙ্ঘন হয়নি। আরেকটি অভিযোগ বলা হয়েছে, শিক্ষাগত যোগ্যতায় তৃতীয় বিভাগ রয়েছে, তবে এই কর্মকর্তার শিক্ষাজীবনে কোনো তৃতীয় বিভাগ নেই বলে সনদপত্র যাচাই করে দেখা গেছে। অপর একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, বাস্তবকাজের অভিজ্ঞতা না সত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা নিয়োগে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই। আরেকটি অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রারম্ভিক পদ থেকে অ্যাডহক থাকাকালীন পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, অথচ তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন, সেই পদেই বহাল ছিলেন। ভিন্ন ডিগ্রীধারী হওয়া সত্ত্বেও তাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ তিনি ভিন্ন ডিগ্রীধারী নন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী। শুধু এই কর্মকর্তাই নন, অধিকাংশ কর্মকর্তার নামে আনা এমন অভিযোগের ভিত্তি নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী ২৪২ জনই ১ বছরের বেশি বেতনভাতা নিয়েছেন। কিন্তু বাকিদের আসামী করা হয়নি। এছাড়া বয়সের বিষয়ে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, বিশ^বিদ্যালয় আইনে নিয়োগে বয়সের কোনো উল্লেখ নেই। এখানে আইনের কোনো ব্যতয় ঘটেনি। যে আইন দেখিয়ে দুদক মামলা দায়ের করেছে, বিশ^বিদ্যালয়ের ৫ম সিন্ডিকেট সভায় অ্যাডহক ভিত্তিতে কর্মরত কর্মচারীদের বয়স সংক্রান্ত বিষয় ও অভিজ্ঞতা যোগ হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে সেই নিয়োগের বৈধতা দিয়েছে স্বয়ং বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অথচ নিরীহ ৫৬জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদেরকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।





