বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:১৮:৩৩ অপরাহ্ন
‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুসহ ৯ প্রতিশ্রুতি
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের অঙ্গীকার

জালালাবাদ রিপোর্ট : দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে’ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশ্বাস এবং বিগত সময়ে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই ইশতেহার ঘোষণা করছে বিএনপি। ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছে দলটি।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করছে বিএনপি। ইশতেহার ঘোষণা করেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এটাই তারেক রহমানের প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা।
যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো-
১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খালখনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
ইশতেহারকে পাঁচটি ভাগ :
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে।
সেগুলো হলোু রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার; বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন; ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার ; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারকে আবার পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে বিএনপি। এর মাঝে আছে- গণতন্ত্র ও জাতিগঠন; মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান; সাংবিধানিক সংস্কার; সুশাসন এবং স্থানীয় সরকার।
বিএনপি মূলত বিগত সময়ে তাদের ঘোষিত ৩১ দফাকেই সামনে আনছে।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই সনদের অনেক বিষয়ই বিএনপির উত্থাপিত ৩১ দফার অন্তর্ভুক্ত। তারই একটা ‘১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়’ এই প্রস্তাবটি। তারেক রহমান জানান, এই প্রস্তাবটি বহু আগেই বিএনপি উত্থাপন করেছে।
তিনি আরও জানান, আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে দলটি ক্ষমতায় এলে জুলাই সনদ ও বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়ন করবে।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের মাঝে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানসহ ‘ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের’ সুবিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি বলেছেন, আমরা দেখেছি, এটিকে কীভাবে একটি পরিবারের বা দলের করার চেষ্টা করে হয়েছে। তাই নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
এছাড়া, সাংবিধানিক সংস্কারের প্রথমেই থাকছে ‘সর্ব শক্তিমান আল্লাহ’র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটিকে সংবিধানের মূলনীতি করা।
তারেক রহমান বলেন, যে বিএনপি বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ‘সর্ব শক্তিমান আল্লাহ’র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’- এই দু’টো বিষয় যুক্ত করেছিলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ ‘সর্ব শক্তিমান আল্লাহ’র প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটিকে সরিয়ে দেয়। তাই বিএনপি ক্ষমতায় এলে এটিকে পুনঃস্থাপন করতে চায়।
তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা’র ওপরও বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান স্থানীয়ভাবে করা সম্ভব।
এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা; উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন; প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা; সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন; উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী; বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার; ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন; জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান; জুলাই হত্যার বিচার; গণঅভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষাসহ আরও অনেক বিষয় এতে উল্লেখ আছে।
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা-এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।





