নির্বাচনে সম্পর্কের পরীক্ষায় ভারত, কৌশলী চীন
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:২৮:০৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যও নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে যেখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে প্রভাব বিস্তারে কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে চীন।২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম নির্বাচন। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পররাষ্ট্রনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
চীনের দিকে ঢাকার ঝোঁক:
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকার—উভয়ই আগের চেয়ে বেশি চীনমুখী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, বাংলাদেশ এখন বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক চীনের কৌশলগত চিন্তাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
ড. ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর চীনে হওয়াকেও এই কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে দুই দেশ ভারতের নিকটবর্তী একটি প্রস্তাবিত উত্তরাঞ্চলীয় বিমানঘাঁটির কাছে ড্রোন কারখানা স্থাপনের বিষয়ে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দেলোয়ার হোসেনের মতে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় অপরিবর্তনীয়।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন:
অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত আশ্রয় দেওয়ায় নয়াদিল্লির প্রতি ক্ষুব্ধ ঢাকা। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘অবিরাম বৈরিতা’র অভিযোগ তোলে।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৭০ জন নিহত হয়েছেন। তবে ঢাকা এই সহিংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিত করার অভিযোগে ভারতকে দায়ী করেছে।
তবুও সম্পর্ক মেরামতের কিছু উদ্যোগ দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। বিএনপি নির্বাচনে এগিয়ে থাকলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত তারেক রহমানের প্রতিও সমবেদনা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তবে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর বিক্ষোভের জেরে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা কতটুকু?
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক দোন্থি মনে করেন, উভয় দেশই সম্পর্কের অবনতি কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে—তা ভালোভাবেই বোঝে। তার মতে, নতুন সরকার অস্থিতিশীলতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেবে।
এদিকে এক দশকের বেশি সময় পর পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালু করে ঢাকা, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি খারাপ না করেই ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথেই হাঁটবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে ভারতের সাবেক উপ-হাইকমিশনার দিলীপ সিনহার মতে, চীন অবকাঠামো খাতে এমন সুবিধা দেয় যা ভারত পারে না। তবে বিদ্যুৎ এবং পোশাকশিল্পের কাঁচামালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
বিশ্লেষকদের সারকথা—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে বৈরিতা নয়। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, এটি ‘একটা না হলে আরেকটা’ পরিস্থিতি নয়। দুই সম্পর্কই একসঙ্গে বিকশিত হতে পারে।-এএফপি




