সিলেটের ৬ আসনে শেষমুহূর্তের হালচাল
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:১৩:০৩ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট জেলার ৬টি আসনে শেষমুহূর্তে এসে প্রার্থীরা অন্তর্মুখী প্রচারণার দিকে বেশি মনযোগ দিচ্ছেন। গতকাল সোমবার ছিল প্রচারণার শেষদিন। আজ থেকে ব্যক্তিগতভাবে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন প্রার্থী ও সমর্থকরা।
মাঠের হিসেবে ৬টি আসনের মধ্যে ভোটারদের দৃষ্টিতে তিনটিতে এগিয়ে আছে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। ধানের শীষের প্রার্থীরা প্রার্থীরা দুইটিতে এবং একটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। শেষমুহূর্তে এসে ভোটাররা দলীয় ইমেজ ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজের প্রতি বেশি খেয়াল রাখছেন।
সিলেট-১:
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করে সে দলই সরকার গঠন করে-এমন একটি কথা প্রচলিত। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে সত্যও হয়েছে এটি। সেই সূত্র ধরে ঐতিহ্যবাহী আসনে পরিণত হওয়া এই আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া বিএনপি ও জামায়াত।
সিলেট সিটি ও সদর নিয়ে গঠিত এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান এবং ধানের শীষ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন কাস্তে, বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল মই, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া আপেল, গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ট্রাক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান হাতপাখা এবং বাসদ (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্তি দাস কাঁচি প্রতীক নিয়ে এই আসনে নির্বাচন করছেন।
তবে ভোটার ও জনতার আকর্ষণ মূলত জামায়াত জোট ও বিএনপি প্রার্থীদের দিকে। আসনটিতে এবার ভিন্ন মেজাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলের প্রার্থীরা। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসনটিতে জয়লাভ করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। তাদের জয়-পরাজয় দলের আত্মমর্যাদার বিষয় বলে বিবেচনা করছেন তারা।
নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট-১ আসনে নিজেদের নিয়মিত নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারের কাজ করছেন জামায়াতের নারী সদস্যরা। তাদের এই কৌশলকে আমলে নিয়ে একইভাবে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নারী নেত্রীরাও।
তবে এই আসনে বিএনপি প্রার্থী বড়ো অংকের ঋণ ও দলীয় চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি প্রার্থীর কিছুটা ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে ভোটারদের মধ্যে। সেইদিক থেকে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। সেবামূলক কাজের মাধ্যমে ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং বিনামূল্যে জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের মাধ্যমে সবার তরুণ প্রজন্মসহ বেশিরভাগের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বলে মনে করেন ভোটাররা। তাছাড়া দলীয়ভাবে গণজোয়ার দাঁড়িপাল্লার পক্ষে থাকায় মাওলানা হাবিব অনেকটা সুবিধা পাচ্ছেন ভোটের প্রচারণায়। বিএনপি প্রার্থী খন্দকার মুক্তাদীর ব্যক্তিগতভাবে ভদ্র এবং অমায়িক হলেও চাঁদাবাজির কারণে দলীয় ইমেজ সংকট তাকে ভোটের দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে নারী ও তরুণ ভোটাররা ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য তাদের।
সিলেট-২:
বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর নিয়ে গঠিত এ আসন নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ঘাঁটি হিসেবে তার প্রতি মানুষের আলাদা দুর্বলতা আছে। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী দেওয়া হয়েছে ইলিয়াস পত্নী তাহসিনা রুশদী লুনা। ইলিয়াস আলীর প্রতি মানুষের আলাদা দুর্বলতা থাকলেও বিএনপির ইমেজ সংকট ও ব্যক্তিগত সেবামূলক কাজ এবং দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার নিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলের সিলেট জেলার নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান। তবে জোটের সিদ্ধান্তের কারণে তিনি প্রার্থীতা প্রত্যাহার করায় লুনা কিছুটা নির্ভার অবস্থায় আছেন। এখন ধানের শীষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াত জোটের প্রার্থী দেওয়াল ঘড়ি মার্কায় খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মুনতাসির আলীর মধ্যে। শেষ মুহূর্তে ইলিয়াস সিম্পেথি নাকি পরিবর্তিত বাংলাদেশের প্রতি ভোটারা রায় দেন তা এখন দেখার বিষয়।
বিএনপি জামায়াত জোট ছাড়াও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণফোরামের মুজিবুল হক উদীয়মান সূর্য, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন হাতপাখা এবং লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী।
সিলেট-৩:
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন জামায়াত নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্তের কারণে এই আসনে এগারো দলীয় জোটের মনোনয়ন দেওয়া হয় বর্ষিয়ান আলেমে দ্বীন মরহুম নুরুদ্দিন আহমদ গহরপুরী র. এর ছেলে খেলাফত মজলিসে সদ্য যোগ দেওয়া মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে। তিনি রিকশা মার্কা নিয়ে লড়ছেন। এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী প্রবাসী বিএনপি নেতা আব্দুল মালিক। লোকমান আহমদ সরে যাওয়ায় কোনঠাসা আব্দুল মালিকের পালে লাগে উত্তরীও হাওয়া। তবে শেষদিকে এসে জামায়াত নেতা লোকমানসহ জোটের কর্মী সমর্থকরা রিকশা মার্কার ব্যাপক প্রচারণায় নামায় ভোটের সুর ঘুরতে শুরু করে। শেষমুর্হূতে এসে ধানের শীষের প্রার্থী আব্দুল মালিক কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও মাওলানা রাজুর দিকে ভোটারের পাল্লা ক্রমশ ভারী হচ্ছে। এতে ভোটে এখানে লড়াইয়ের ইংগিত দেখছেন ভোটাররা।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আনওয়ারুল হক হাতপাখা, জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী ফুটবল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকর কম্পিউটার।
সিলেট-৪:
সীমান্ত জনপদ জৈন্তা, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। বিএনপি থেকে এখানে লড়ছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ধানের শীষ এবং জামায়াতে ইসলামীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন দাঁড়িপাল্লা।
এখানে জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান লাঙ্গল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ হাতপাখা এবং গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম ট্রাক প্রতীক নিয়ে লড়লেও তাদের প্রতি তেমন সাড়া দেখা যায়নি ভোটারদের মধ্যে। শুধু কোম্পানীগঞ্জে প্রত্যান্ত কিছু জনপদে হাতপাখার নিজস্ব কিছু ভোটার আছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এরবাইরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন আরিফ-জয়নাল। এ পর্যন্ত এই আসন থেকে দাঁড়ানো প্রার্থীদের মধ্যে একমাত্র স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে জয়নাল আবেদিন আলাদা অবস্থান ও ভোটব্যাংক তৈরি করতে পেরেছেন। তবে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি এবং সিসিকে আওয়ামীলীগের সাথে মিলে উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তি শুনিয়ে অবহেলিত এই জনপদে উন্নয়নের গীত শুনিয়ে অনেকটা জায়গা করতে পেরেছেন আরিফুল হক। এর বাইরে কওমী ঘরনা বেশ ভোট আরিফ তার দিকে টানতে পেরেছেন। তাই শেষ দিকে এসে স্থানীয় ছেলে নাকি বিএনপি প্রার্থী আরিফকে ভোটাররা বেছে নেন তা এখনই হলফ করে বলতে পারছেন না কেউ।
সিলেট-৫:
জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এগারো দলীয় জোট থেকে মনোনয় দেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি মাওলানা আবুল হাসানকে। তিনি দেওয়াল ঘড়ি নিয়ে লড়ছেন।
জোট ও জনতার মাঝে তুমুল জনপ্রিয় মুফতি আবুল হাসান ভোটের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) ফুটবল। এই আসনে বিএনপি জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের খেজুর গাছে সমর্থন দেওয়ায় এখানে ধানে শীষের কোনো প্রার্থী নেই। ফলে ধানের শীষ সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে তার উপর নির্ভর করে মামুন না ফারুক কে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসেন। এছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগের বিলাল হোসেন হারিকেন প্রতীক নিয়ে লড়ছেন এখানে।
সিলেট-৬:
সিলেটের সবচেয়ে ভিআইপি আসনের মধ্যে একটি গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারের এই আসন। এখানে জামায়াত জোট থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লড়ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মু. সেলিম উদ্দিন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অবস্থান, দলীয় ঐক্য ও ব্যক্তিগত ইমেজ নিয়ে সেলিম উদ্দিন এখানে অনেকটাই এগিয়ে। সেই তুলনায় ধানের শীষের প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইমেজ নানান কারণে সংকটে। তার ভাইরাল হওয়া একাধিক আপত্তিকর ভিডিও সমর্থক থেকে নিজ উপজেলা গোলপগঞ্জের মধ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এর বাইরে দলীয় কোন্দলও এখানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে এই আসনে এক সময় জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে আভাস মিললেও যত সময় ঘনাচ্ছে এখানে এমরান চৌধুরীকে দিয়ে ইমেজ উদ্ধার সম্ভব নয় বলে মনে করছেন অনেকেই। এই আসনে অন্যান্যের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান (ট্রাক) এবং জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আব্দুন নূর লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।





