মৌলভীবাজার-১ আসন জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর আ.লীগ ও সংখ্যালঘু ভোট
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭:২৭:২০ অপরাহ্ন
আব্দুর রব, বড়লেখা :
মৌলভীবাজারের সীমান্তঘেঁষা দুই উপজেলা বড়লেখা ও জুড়ী। দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-১ আসনটি স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগের অঘোষিত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিগত বারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হন আটবার। বাকি চারটি নির্বাচনে দুইবার বিএনপি ও দুইবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্বাচিত হন। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় দ্বিধায় ভোগছেন দলটির সাধারণ নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা, আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিজয়মালা পরতে তাদেরকেই টার্গেট করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
মৌলভীবাজার-১ আসন বড়লেখা উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং জুড়ী উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। হালনাগাদ ভোটার তালিকা অনুযায়ী বড়লেখায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৬ জন ও জুড়ীর ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ৭২০ জন। দুই উপজেলার সর্বমোট ভোটার (নারী-পুরুষ) ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৬ জন।
মৌলভীবাজার-১ আসনে নির্বাচনি মাঠে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ (ধানের শীষ), জামায়াতের মাওলানা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন (লাঙ্গল), আল ইসলাহ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী বেলাল আহমদ (কাপ পিরিচ) ও গণফ্রন্ট প্রার্থী মো. শরিফুল ইসলাম (মাছ)। গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী আব্দুন নুর তালুকদার বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। পাঁচ প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে তৎপর থাকলেও মুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি প্রার্থী নাসির উদ্দিন আহমেদ ও জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আমিনুল ইসলামের মধ্যে হচ্ছে এমনটাই সাধারণ মানুষের মুখে শুনা যাচ্ছে। তবে, বিএনপির দীর্ঘদিনের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি আসন ধরে রাখতে ধানের শীষের জোরালো প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনি মাঠ ঘুরে ভোটার ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ি এই আসনের সংখ্যালঘু (চা শ্রমিকসহ) ভোটার সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এইসব ভোটারই মুলত আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক এবং যাদের কারণে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে। সংখ্যালঘু, চা শ্রমিক আর আদিবাসি ভোটারদের সিংহভাগ ছাড়াও আওয়ামী লীগের নিজস্ব ভোট রয়েছে আরো প্রায় ৬০ হাজার। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ভোট নৌকার বাক্সেই পড়েছে। আর এই ভোটব্যাংককে পুঁিজ করেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বারবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছাড়াই বিজয়ী হয় নৌকার প্রার্থী। চব্বিশের জুলাই পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণায় সম্মুখ সারির নেতাকর্মীদের কেউ পালিয়েছেন বিদেশে, কেউবা রয়েছেন আত্মগোপনে; আবার কেউ জেলে। এই অবস্থায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দ্বিধায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকরা। এদিকে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের নানা কৌশলে নিজেদের পক্ষে নিতে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-১ আসনের নির্বাচনি জয়-পরাজয় নির্ভর করবে আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু নিরব ভোটারদের উপর। যে প্রার্থী আওয়ামী লীগের ও সংখ্যালঘু ভোটারদের বেশি সমর্থন আদায় করবে সেই প্রার্থীই বিজয়মালা পরবেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই আসনের পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের দলীয় নির্দেশনা রয়েছে, তারা যেন লাইভে গিয়ে নেতাকর্মীদের ভোট বর্জনের আহ্বান জানান। কিন্তু কোনো আওয়ামী লীগ নেতা এখন পর্যন্ত সেই নির্দেশনা প্রতিপালন করেননি। বরং বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের নেতাকর্মীদের ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এতে প্রতিয়মান হচ্ছে আওয়ামী লীগের নিবর ভোটগুলো বিএনপি প্রার্থীর বাক্সেই ঢুকবে।
বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন জানান, এই আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন বলে অনেকেই নিশ্চিত করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রতি সব সময়কার যে সাপোর্ট ছিল, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটেছে। তারা বুঝে গেছেন শেখ হাসিনা ফ্যাসিষ্ট। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সংরক্ষণে বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বিএনপির বিকল্প নেই। বিএনপি আশা করছে সংখ্যালঘুসহ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৮০ ভাগ ভোটার ধানের শীষে ভোট দিবেন।
জামায়াত প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, ১৭ বছর আগের জামায়াতের ভোটের হিসেব-নিকেশ বর্তমানে অনেক পাল্টেছে। যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই দাঁড়িপাল্লার জোয়ার দেখছেন। জামায়াতের নিজস্ব ভোট ছাড়াও সংখ্যালঘু, চা শ্রমিক, আদিবাসি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিবেন এমনটাই আশা করছেন।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতা পরবর্তীতে পরপর দুইবার আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক সিরাজুল ইসলাম, তৃতীয়বার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মুক্তিযুদ্ধের আরেক সংগঠক ইমান উদ্দিন আহমেদ, এরপর অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী দুইবার জাতীয় পার্টি থেকে ও দুইবার বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন শাহাব উদ্দিন। যদিও তার পাঁচবারের মধ্যে তিনবারের এমপি নির্বাচিত হওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দশম, একাদশ ও দ্বাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের পাতানো ভোটারহীন নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন।





