‘ফুরিয়ে যায়’ আতঙ্কে পাম্পে দীর্ঘ লাইন!
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন
তেল কেনার সীমা বেঁধে দিলো বিপিসি

স্টাফ রিপোর্টার : ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিতে পারে- এমন আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্পে ভিড় বেড়েছে।
গতকাল শুক্রবার নগরীর প্রায় সব পাম্পেই মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এতে অনেক পাম্পে তেলের কৃত্রিম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে শুক্রবার মোটরসাইকেল প্রতি ২০০/৩০০ টাকার অধিক পেট্রোল বা অকটেন বিক্রি থেকে বিরত থাকছেন পাম্প কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার দুপুরে এবং বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট নগরীর প্রায় সব পাম্প সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ও বিশ্ববাজারে তেলের দামে উঠানামার কারণে দেশেও দাম বাড়বে এমন আশংকায় আগেভাগেই জ্বালানী তেল সংগ্রহ করে রাখতে পেট্রোল পাম্পে ভীড় করেছেন একাধিক ক্রেতা। যদিও বিক্রেতারা জানিয়েছেন, চলতি মাসে দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। তেলেরও পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকে। ফলে ক্রেতাদের অধিক চাহিদার কারণে অনেক পাম্পে তেলের কৃত্রিম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একারণে শুক্রবার মোটর সাইকেল প্রতি ২০০/৩০০ টাকার অধিক পেট্রোল বা অকটেন বিক্রি করছেন না বিক্রেতারা।
এমতাবস্থায় সিলেটসহ সারাদেশে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। শুক্রবার (৬ মার্চ) বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নেওয়া যাবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। এসইউভি/জিপ/মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ/লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার, দূরপাল্লার বাস/ট্রাক/কার্ভাডভ্যান/কনটেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার জ্বালানি তেল নেওয়া যাবে।
বিপিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
শুক্রবার নগরীর একটি পেট্রোল পাম্পের কর্মচারী জানান, সাধারণ সময়ের তুলনায় হঠাৎ করেই জ্বালানি নেওয়ার চাপ বেড়েছে। অনেকেই ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কায় মোটরসাইকেল ও গাড়ির ট্যাংকি পুরোপুরি ভরে নিচ্ছেন। এতে কিছু পাম্পে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।
নগরের পাঠানটুলা এলাকার পেট্রোল পাম্পে দেখা যায়, মোটর সাইকেলের দীর্ঘ লাইন। লাইন ধরে জ্বালানী তেল সংগ্রহ করছেন চালকরা। সুয়েল আহমদ নামের এক মোটরসাইলে চালক বলেন, যুদ্ধের কারণে পেট্রোলের দাম বেড়ে যেতে পারে। তাই একটু বেশি করে তেল কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পাম্প থেকে মাত্র ২০০ টাকার তেল দেওয়া হয়েছে।
পাম্পের ম্যানাজার রুপক দাস বলেন, দাম বাড়ার কোন খবর আমাদের কাছে নেই। যেহেতু সরকার কদিন আগেই (১ মার্চ) দাম অপরিবর্তিত রেখে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এবং আমরা ঐ দামেই জ্বালানি তেল বিক্রি করছি।
নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার একটি পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেট কার চালক জহির মিয়া অভিযোগ করেন, পাম্পে তেলের পরিমাণ কম দেওয়া হচ্ছে। একারণে মানুষের মধ্যে আরও আতংক বেড়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্চ মাসে ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হবে। বিশ্ববাজারে দাম ওঠানামা করলেও আপাতত দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না ।
এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান বলেন, আমাদের কাছে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেন সিলেটসহ পার্শ্ববর্তী ডিপোগুলো থেকে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া মাসের মাঝামাঝি সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী মাস শেষেই প্রয়োজন হলে মূল্য সমন্বয় করা হয়। অতএব, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি পেট্রোল পাম্পগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির সময় ডিপো বন্ধ, এমতাবস্থায় অনেকেই আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন, যার ফলে সাময়িকভাবে কৃত্রিম সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পেট্রোল পাম্প গুলো রেশনিং করে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। কারও কারও মজুদ রবিবারের আগেই শেষ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি জুবায়ের আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সিলেটের পাম্পগুলো এখন পর্যন্ত তেলের কোন সঙ্কট হয়নি। আমাদের সিলেটের সবকটি পাম্পগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণের জ্বালানি তেল রয়েছে।
তিনি বলেন, সিলেটের রশিদপুর ও কৈলাশটিলা গ্যাস কূপ থেকে থেকে আমাদের সিলেটের পাম্পগুলো চাহিদা মোতাবেক জ্বালানি তেল সরবরাহ করলেই তেলের সঙ্কট সিলেটে হবে না। হুমড়ি খেয়ে সবাই যদি একসঙ্গে বেশি পরিমাণে তেল নিতে যান, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হবে। এ কারণে অপ্রয়োজনীয় মজুত না করে সাশ্রয়ীভাবে জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।




