মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ মার্চ ২০২৬, ২:৩৮:৩২ অপরাহ্ন
‘আত্মসমর্পণ’ নিয়ে ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান পাল্টাপাল্টি
হাইপারসনিক ব্যবহার ইরানের, বাংকারে লাখ লাখ ইসরায়েলী
জালালাবাদ রিপোর্ট : মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন শুধুই বারুদ আর আগুনের। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় কার্যত বিপর্যয়ের মুখে ইরান। হামলায় ইরানে কমপক্ষে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের ৬ হাজার ৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী এ সংঘাত ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।
অপরদিকে, ইরানও আত্মসমর্পণ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আগ্রাসনের মুখে কোনো পরিস্থিতিতেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে না এবং শত্রুদের উচিত ইরানি জাতি আত্মসমর্পণ করবে-এমন আশা ত্যাগ করা। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে।
এদিকে, ইরান নতুন দফার হামলায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ২৫ তম দফার হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইরান।
আইআরজিসির সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতির বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ কথা জানায়। এতে বলা হয়, আইআরজিসি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সামরিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। এই অভিযানে হাইপারসোনিক ফাতাহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক এমাদ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গতকাল পর্যন্ত ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে অন্তত পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে দেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
এ হামলার জেরে সারা রাত লাখ লাখ ইসরায়েলিকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে (বাংকারে) অবস্থান করতে হয়েছে।
এদিকে, ইরানের আকাশে বিশাল অগ্নিকুণ্ডলী ও ঘন ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে-এমন কিছু ছবি প্রকাশ হয়েছে। এ আগুন ও ধোঁয়া তেহরানের প্রধান এবং ব্যস্ততম মেহরাবাদ বিমানবন্দরের দিক থেকে উঠতে দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে এ ছবিগুলো নেওয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ভিডিওটির অবস্থান যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, তারা ভিডিওটির সঠিক তারিখ যাচাই করতে না পারলেও ৭ মার্চের আগে ইন্টারনেটে এই ফুটেজের পুরোনো কোনো সংস্করণ খুঁজে পায়নি।
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটিতে অন্তত ৬ হাজার ৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব হামলার সময় বেশ কিছু উদ্ধারকারী ও ত্রাণবাহী যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত থাকাকালে রেড ক্রিসেন্টের বেশ কয়েকজন কর্মীও আহত হয়েছেন।
তেহরান ও ইসফাহানে ইসরায়েলের ‘ব্যাপক আকারে’ নতুন দফা হামলা শুরু
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শনিবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি ইরানের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নবাদী শাসনব্যবস্থার’ মাধ্যমে শুরু হওয়া উসকানিহীন যুদ্ধের মুখে দেশের ভেতরের সব মতপার্থক্য দূরে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরী।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে শক্তভাবে নিজেদের দেশ ও মাতৃভূমি রক্ষায় এক হতে হবে।
দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ শুক্রবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ইরানের ওপর হামলা না হলে সেসব দেশে আর কোনো আক্রমণ চালানো হবে না।
আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ এবং পরিস্থিতি অনিরাপদ হওয়া সত্ত্বেও নৌবাহিনীর বারবার দেওয়া সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় ট্যাংকারটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা শনিবার সকালে ইরাকের কুর্দি-অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে কুর্দিদের তিনটি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
তাসনিম বার্তা সংস্থায় প্রকাশিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তাঁদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
এদিকে, ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শনিবার বলেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে। ‘আর তাদের দিকে হামলা চালাবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাঁর দাবি, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিরামহীনভাবে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় এই প্রতিশ্রুতি এসেছে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের মন্তব্যের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের চিন্তন প্রতিষ্ঠান ডিপ্লো হাউসের পরিচালক বিশ্লেষক হামিদরেজা গোলামজাদে। তিনি বলেন, পেজেশকিয়ানের মন্তব্যকে ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে ট্রাম্পের ব্যাখ্যা ‘পুরোপুরি মিথ্যা’।




