জ্বালানি তেল নিয়ে নানান উদ্যোগ, তবুও শঙ্কা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ মার্চ ২০২৬, ৮:২১:২৯ অপরাহ্ন
# বিপণনের নতুন সময়সূচি ঘোষণা
# ডিপোর নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন
# পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগে

জালালাবাদ রিপোর্ট: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে নানা তেলসমাতি শুরু হয়েছিল। তেলের সংকট, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, মজুতদারী ইত্যাদি নিয়ে বেশ কয়েকদিন চলে হুলুস্থুল। জ্বালানি তেলের এই সংকট নিয়ে সরকার দ্রুত নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য ছাড় করার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। ডিপোগুলোর নিরাপত্তা জোরদার, মজুতদারি রোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে শনিবার থেকে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের। নিয়োগপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসাররা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ও বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন এবং দৈনিক প্রতিবেদন জমা দেবেন। তবে সরকারে এত উদ্যোগের পরও জনগণের মনে তেল সংকট নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। বিশ্ব পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং দেশে বিগত দিনের নানান উদ্যোগ সুযোগসন্ধানী সিন্ডিকেটের কবলে মাঠেমারা যাওয়া নিয়েই মূলত এই শঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে। শনিবারও বিভিন্ন স্থানে পাম্পে অভিযান চালিয়ে লুকিয়ে রাখা জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। এসব পাম্পে তেল শেষ বলে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এভাবে অভিযান কদিন চলবে তা নিয়েও মানুষের মনে আস্থার সংকট দেখা গিয়েছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে রাজনৈতিক নানান হস্তক্ষেপে এসব অভিযান বন্ধ হয়ে যেতে।
এরআগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিকল্প উৎস থেকে তেল-গ্যাস আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। শুরুতে সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠানই আগ্রহ দেখালেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি মিলেছে খুব কম। একই ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির ক্ষেত্রেও। ফলে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।
বাংলাদেশে তেল-গ্যাস আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা বেশি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই দুই খাতেই বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়। তবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অন্য দেশগুলোও একই চেষ্টা চালানোয় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও ইরান জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাহাজ জ্বালানি নিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি স্থাপনায় একের পর এক হামলার কারণে কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সরকারি ডিপো থেকে জ্বালানি তেল বিপণনের নতুন সময়সূচি ঘোষণা: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য ছাড় করার নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। শনিবার বিপিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংস্থার অধীন কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম সকাল ৭টায় শুরু হবে এবং বেলা ৩টায় শেষ হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির নির্দেশনায় বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ চালু রয়েছে। এই সরবরাহ কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করতে ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য ছাড়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশব্যাপী ফিলিং স্টেশন, প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ও পাম্পে সঠিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এর পাশাপাশি ফিলিং স্টেশন, ‘প্যাকড পয়েন্ট’ ডিলার ও পাম্পগুলোকে দৃশ্যমান স্থানে ‘ব্ল্যাক বা হোয়াইট বোর্ডে’ জ্বালানি পণ্য গ্রহণের তথ্য প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিপিসি বলেছে, সেখানে অন্তত চার ধরনের তথ্য দেখাতে হবে। সেগুলো হল, জ্বালানি পণ্যের নাম, গেল বছরের মার্চ মাসে প্রাপ্তির দৈনিক গড়, চলতি মার্চ মাসে প্রাপ্তির দৈনিক গড় এবং অদ্য প্রাপ্তির পরিমাণ।
অর্থাৎ, প্রতিটি স্টেশন বা পাম্পে বর্তমান সরবরাহকে আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখানোর পাশাপাশি প্রতিদিন কত জ্বালানি পাওয়া গেছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।
বিপিসি বলেছে, ২৮ মার্চ দুপুর ১২টা থেকে এই নির্দেশনা কার্যকর করতে তাদের অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে চাপ বাড়ার পর সরকার একের পর এক তদারকি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আগে জেলায় জেলায় ‘ভিজিলেন্স টিম’ গঠন, তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ, সব পেট্রোল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালানোর তথ্য জানানো হয়।
সরকারি হিসাবে, জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একদিনে ৬২ জেলায় ২৯৩টি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।
এসব অভিযানে ৭৮টি মামলা দায়েরের পাশাপাশি ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানা আদায়ের কথাও জানানো হয়। মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে প্রশাসনের পদক্ষেপের উদাহরণও মিলছে।
জ্বালানি ডিপোর নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন: সিলেটে জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোর নিরাপত্তা জোরদার, মজুতদারি রোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা ও মেঘনা তেল ডিপোতে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলায় দুটি এবং পার্শ্ববর্তী মৌলভীবাজার জেলায় তিনটিসহ সারা দেশের মোট ১৯টি জ্বালানি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি ডিপো এলাকায় একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে সদস্যরা নিয়মিত টহল ও তদারকি করছেন। একই সঙ্গে কোনো ধরনের নাশকতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
সিলেটের ১৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুবায়ের আনোয়ার জানান, যেকোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন। তিনি বলেন, সিলেটের পদ্মা ও মেঘনা ডিপোতে ১৯ বিজিবি ও ৪৮ বিজিবির দুই প্লাটুন সদস্য ২৫ মার্চ থেকেই মোতায়েন রয়েছে। ডিপোর নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত টহল জোরদার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট ও ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন এলাকায় আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবহৃত ট্রাক ও লরিতে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
এদিকে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের গুজব প্রতিরোধ এবং পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যারা সরবরাহ ও বিক্রয় কার্যক্রম তদারকি করবেন। এ ছাড়া অবৈধ মজুতদারি বা কারসাজির তথ্য দিলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে কোনো মহল যেন সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, বিজিবি ও প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতায় সিলেটে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং বাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হবে না।
পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত: দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা তদারকি ও সমন্বয় জোরদারে সব পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। শনিবার মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় জানানো হয়, শুক্রবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন করে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ দায়িত্ব পালন করবে।
অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাইরে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে একজন করে সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
নিয়োগপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসাররা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ও বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন এবং দৈনিক প্রতিবেদন জমা দেবেন। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থাকে দ্রুত ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করে তথ্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।




