দেশে হামের বিস্তার, ২১টি উপজেলা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৯:২২ অপরাহ্ন
চিকিৎসক -স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল, কাল থেকে টিকাদান
স্টাফ রিপোর্টার : দেশে হামের বিস্তার হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে সিলেটসহ অন্তত ৫৬ জেলায় হাম শনাক্ত হয়েছে। সরকারি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এতে সংক্রামক রোগটির সারা দেশে ব্যাপক আকারে বিস্তারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
গত ১৯ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে এসব জানানো হয়।
শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে আরও ৯৪৭ শিশু। এ সময় মারা গেছে তিনজন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে ৪২ জনের হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইপিআইয়ের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেশি আক্রান্ত এলাকায় দুই সপ্তাহব্যাপী এই জরুরী টিকাদান কর্মসূচি চালানো হবে। প্রয়োজন হলে এই সময় বাড়ানো হতে পারে। টিকাদান কাল রোববার থেকে শুরু হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২০ থেকে ২১টি উপজেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৫৬টি জেলায়। রাঙামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দারবান-এই আট জেলায় হাম ধরা পড়েনি।
জাতীয় পর্যায়ে সংক্রমণের হার প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় বর্তমানে প্রায় ১৬ দশমিক ৮, যা একটি দেশব্যাপী বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা কার্যালয়কে ১৮ মার্চ জানিয়েছে ঢাকা কার্যালয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এন্ডেমিক (রোগের উপস্থিতি সব সময় থাকে) হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে। এর অর্থ অন্তত ১২ মাস হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ অনুপস্থিত থাকা। এই প্রেক্ষাপটে হাম ও রুবেলা নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ বেশ ভালো করছিল। প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ছিল ২০২২ সালে ১ দশমিক ৪১, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৩ ও ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৭২। বর্তমানে তা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সফল বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। তাহলে এখন কেন এমন সংক্রমণ দেখা দিল—এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ সংক্রমণের মূল কারণ হলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৪ শতাংশ, যা এই কনিষ্ঠতম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ সংবেদনশীলতা নির্দেশ করে।
সংক্রমণ ৫৬টি জেলায় ছড়িয়েছে। তবে কিছু এলাকা এখন সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে। বেশ কিছু জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, সারা দেশে শিশুদের মধ্যে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুক্রবার এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, আপদকালীন নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও অধিদপ্তরের অধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে এটি জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদেশটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




