প্রকট হচ্ছে তেল সংকট
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৫:১৮ অপরাহ্ন
প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যবসায়ীদের বৈঠক
স্টাফ রিপোর্টার: সময় যত যাচ্ছে দেশে জ্বালানি তেল সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। সারদেশের এই রেশ এসে লেগেছে সিলেটেও। মানুষের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংকট ও ঘাটতি মোকাবেলায় মার্কেট ও দোকান সন্ধ্যার মধ্যে বন্ধের সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হওয়া ইত্যাদি নানান করণে উৎকণ্ঠা বেড়েছে মানুষের মনে। ব্যবসায়ীরা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।
ইতিমধ্যে শনিবার দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসুর মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত ও বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহ চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং সাশ্রয়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। ইতোমধ্যে জ্বালানির ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যবস্থা ও পরিবহন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে জনগণকে সচেতন করতে সরকারের দৃশ্যমান ফলপ্রসূ তেমন উদ্যোগও নেই। জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট সরকারের খাতগুলো দ্রুত ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু মজুদদারি ও বাজারে ‘প্যানিক বায়িং’ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচতে জ্বালানি সাশ্রয়কে এখনই সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা অর্থনীতি। পণ্য পরিবহনে বাড়ছে খরচ। ডিজেল না পেয়ে কৃষি সেচও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হচ্ছে সার কারখানাও। এর ফলে আসন্ন মৌসুমে সারের তীব্র সংকটে প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য উৎপাদনেও। জ্বালানি সংকট ও অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার মধ্যে কৃষি উৎপাদন হ্রাস, সেচ কার্যক্রম ব্যাহত এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। মধ্যপাচ্যের যুদ্ধ দীঘস্থায়ী হলে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যর্থ হলে দেশের অনেক এলাকায় নেমে আসতে পারে দীর্ঘ অন্ধকার।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যবসায়ীদের বৈঠক: বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাসহ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা বিষয় নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়; শেষ হয় দুপুর আড়াইটার দিকে। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফটকে সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, “দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা হচ্ছে, সংকট আছে, সেগুলো দূর করার বিষয়ে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা তাদের কথা বলেছেন। “অনেক কিছুর সমাধান হয়েছে। আবার অনেক কিছু ‘পেন্ডিং’ আছে, সেগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে।” জ্বালানি সহায়তা বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, “মাল্টিলেটরাল বডিগুলো থেকে বিভিন্ন সহায়তা আসছে। আমরা সবার সহযোগিতা পাচ্ছি মাল্টিলেটরাল বডিগুলো থেকে।”
ব্যবসায়ীদের মধ্যে ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, বে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, রাংগস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী ও এসিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ দৌলা উপস্থিত ছিলেন।
জ্বালানি নৈরাজ্যে বড় ভোগান্তির শঙ্কা: জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের চেয়ে ব্যবস্থাপনা সংকট এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অফিস ও মার্কেট নিয়ে দিনের আলো ব্যবহারে যে ঘোষণা সরকার দিয়েছে, এটা আরও আগেই দেওয়া উচিত ছিল। সরকারকে এটা উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে যে, তারাই আগে জ্বালানি সাশ্রয় করছে। এমপি-মন্ত্রীসহ সরকারি কর্মকর্তাদের গণপরিবহনে যাতায়াত করে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি গাড়ি গ্যারেজ রেখে তাদের তেলের জন্য বরাদ্দ টাকা আপাতত বন্ধ করে দিতে হবে। জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা আরামে থাকলে সমস্যার সমাধান না হয়ে আরও প্রকট হবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশ জ্বালানি সংকটে উৎপাদন পরিবহনে ধস নামার পাশাপাশি অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, মধ্যপাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি খাতে আমাদের ভঙ্গুর অবস্থার জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছে। সরকারের জ্বালানির খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটের সময়ে ঠিকঠাক কাজ করছে না। তারা নির্বিচারের লুণ্ঠনকে কাঠামোগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বছরের পর বছর জনগণের কাছ থেকে উচ্চ মুনাফা নিয়েছে এবং সেই অর্থ বিভিন্ন প্রজেক্টের নামে তছরুপ করেছে। জ্বালানিতে কাঠামোগতভাবে সমস্যাগুলো যেভাবে তৈরি হয়েছে, এই সংকটে সরকার তার সংস্কার করলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল তৈরি হবে।
অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার নানাভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে, আরও নেবে। তবে আমাদের যা দরকার, সে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করার মতো সাধ্য-সামর্থ্য নেই। আর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যে হারে বাড়ছে, জ্বালানি পেলেও ডলার জোগাড় করতে পারব না চাহিদা মতো জ্বালানি কেনার জন্য। এখন আমাদের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করতে হবে। আর জ্বালানি ভোক্তা যে জনগণ, তাদের নিয়ে সংকটের মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারকেই উদাহরণ তৈরি করতে হবে। তারা এসি গাড়িতে ঘুরবে আর এসি রুমে বসে অফিস করলে জনগণ জ্বালানি-সাশ্রীয় হবে না।
সংকট বাড়াচ্ছে প্যানিক বায়িং : সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে দেখা যাচ্ছে প্যানিক বায়িং। সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি তেল বা এলপি গ্যাস কিনে মজুদ করছেন। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং খোলা বাজারে দাম বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্যানিক বায়িং আসলে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকে, তখন তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনতে শুরু করে। সামগ্রিকভাবে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আশস্ত করতে হবে যে কেউ ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হবে না।
উৎপাদন ও পরিবহন খাতে অস্থিরতা : জ্বালানি সংকটের জেরে উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন খাতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ডিজেল ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি সেচ ব্যবস্থা। ডিজেলের সংকটে চালানো যাচ্ছে না সেচ পাম্প। ফলে বোরো ধানসহ ফসলের উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে। ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির সংকটে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং নৌযানের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা পণ্য পরিবহন খরচ ও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজার তদারকি ও জনসচেতনতার অভাব : জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাজার তদারকি ও জনসচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান ও মনিটরিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা স্থায়ী প্রভাব ফেলছে না। জ্বালানি সাশ্রয় ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়ে কার্যকর জনসচেতনতা গড়ে ওঠেনি। বিদ্যুৎ অপচয়, অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার এবং গ্যাসের অপচয় এখনও ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি সাশ্রয়কে যদি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা না যায়, তাহলে শুধু সরকারি পদক্ষেপে সংকট কাটানো সম্ভব নয়। জনগণকে এটা বোঝাতে হবে যে, আজকে অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা অপচয় করলে আগামীকাল অন্ধকারে থাকা লাগতে পারে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রচারণা চালাতে হবে।




