কুকুরের ভয়াবহতা, অসহায় সিসিক : অপ্রতুল ভ্যাক্সিন, মিলছে অর্ধেক
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ৪:০০:০৫ অপরাহ্ন

মুনশী ইকবাল : চুরি-ছিনতাই-চাঁদাবাজি সব ছাপিয়ে সিলেট নগরবাসীর এখন এক আতঙ্কের নাম কুকুর। এই আতঙ্কে এখন দিনরাত পার করছেন নগরবাসী। ব্যস্ত রাস্তা, পাড়ামহল্লাসহ সব জায়গায় দেখা যায় দলবদ্ধ কুকুরের মেলা। এদিকে কুকুর নিধন ও নিয়ন্ত্রণে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোনো অ্যাকশনে যেতে পারছে না নগর কর্তৃপক্ষ। ফলে কুকুরের এই ভয়াবহতায় একেবারে অসহায় সিসিক।
এ থেকে পরিত্রাণে নগরবাসীর তীব্র গণআন্দোলনের বিকল্প দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন মানুষ রাস্তায় নামলে কিংবা আইনীভাবে আদালতে মোবাবিলা করলেই এ নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
কুকুর নিয়ে পুরনো এই আতঙ্কের সাথে নতুন করে আরেক আতঙ্কের কারণ ভ্যাক্সিন সংকট। পুরো মাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ মিলছে মাত্র অর্ধেক। কুকুরের পাশাপাশি একই ভ্যাক্সিন বিড়াল, বানরের কামড়েও দেওয়া হয়। ফলে ভ্যাক্সিনের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে, কিন্তু সরবরাহ বাড়ছে না। বছরখানেক আগেও যে ভ্যাক্সিনে চাহিদা পূরণ হয়ে যেতো বর্তমানে সেই সংখ্যক ভ্যাক্সিনে মাসের অর্ধেকও যাচ্ছে না। এতে বুঝা যাচ্ছে ভ্যাক্সিনের চাহিদা বেড়েছে, মানে কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। যেখানে নগর ও সিলেট জেলার সবাই চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ভ্যাকসিন অপ্রতুল। ভ্যাক্সিন সরবরাহ না বাড়লেও প্রতিদিন বাড়ছে কুকুর বিড়ালের কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যা। প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০ জন আক্রান্ত ভ্যাক্সিন নিতে আসেন। সেই অনুপাতে প্রতিমানে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার ভ্যাক্সিনের প্রয়োজন হলেও মিলছে মাত্র ২ হাজার। যা মাসের অর্ধেক যেতে না যেতেই শেষ হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে শহীদ শামসুদ্দীন সদর হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মিজানুর রহমান ভ্যাক্সিন সংকটের কথা স্বীকার করে জানান, চাহিদার তুলনায় অর্ধেক ভ্যাক্সিন তারা পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে কুকুর নিধন বন্ধ থাকায় কুকুরের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে কুকুরের কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যা। এছাড়া কুকুরের পাশাপাশি অনেকেই এখন বিড়াল পালন করেন। বিড়ালকে ভ্যাক্সিন দিয়ে পালন করার কথা থাকলেও অনেকই তা করেন না। ফলে বাসাবাড়িতে এসব বিড়াল যখন বাচ্চাদের কামড়ায় তখন তারাও হাসপাতালে ভ্যাক্সিন নিতে আসেন।
তিনি জানান, শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০ জন পশুর কামড়ে আক্রান্ত ভ্যাক্সিন নিতে আসেন। এখানে কুকুরের পাশাপাশি বিড়াল, বানর ও শেয়ালের কামড়েরও ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়। সেই অনুপাতে তাদের প্রতিমাসে ৪ হাজারের মতো ভ্যাক্সিন দরকার। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন থেকে মাত্র ২ হাজার ভ্যাক্সিন সরবরাহ করা হয়। বারবার চাহিদা, তাগাদা দিয়েও চাহিদার অর্ধেক ভ্যাক্সিন মিলে। ডা. মিজান জানান তাদের নিজস্ব ফ্রিজিং ব্যবস্থা আছে, তাই একবারে চাহিদা সম্পন্ন ভ্যাক্সিন দিলে তারা তা সংরক্ষণ করতে পারবেন।
২০১৯ সালে বেওয়ারিশ কুকুর নিধন না করার জন্য উচ্চ আদালত থেকে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তারপর থেকে কুকুর নিয়ন্ত্রণের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখে, সিটি কর্পোরেশন। ফলে ছয় বছরে নগরে অন্তত কয়েকগুণ বেড়েছে কুকুরের সংখ্যা। এ থেকে পরিত্রাণে অনেকেই বলছেন মানুষকে রাস্তায় নামতে হবে। নিজেদের স্বার্থে, বাচ্চাদের নিরাপত্তায় কুকুর নিয়ন্ত্রণে আদালতের সামনে বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। তীব্র গণআন্দোলন কিংবা মামলা রিট ইত্যাদির মাধ্যমে তা আইনীভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
সরেজমিন গত কয়েকদিনে দেখা যায় একদিকে কুকুর নিয়ন্ত্রণে নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেকটা অসহায় সময় পার করছেন নগরবাসী। পাড়া-মহল্লার অলিতে গলিতে দলবেঁধে ঘুরে বেওয়ারিশ কুকুর। প্রতিদিন শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়েসী মানুষ কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। স্কুলগামী বাচ্চারা সকালে কুকুরের ভয়ে স্কুল যেতে ভয় পায়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অব্দি থেমে থেমে দলবেধে কুকুরের চিৎকারে আতকে উঠেন লোকজন। বাচ্চারা ভয়ে ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠে।
কুকুর বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে দিনের বেলাতেও চলাফেরা করতে ভয়ের কথা জানান পথচারীরা। রাত হলেতো কথাই নেই। মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে বসে কুকুরের দল। তাদের আগ্রাসী আচরণ ভয় ছড়াচ্ছে সকল বয়েসি মানুষের মধ্যে।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, কুকুর নিধন না করার জন্য উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ জন্য কুকুর নিধন করা যাচ্ছে না। এমনকি জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও গ্রহণ করা যাচ্ছেনা। কারণ আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কোনোভাবে প্রাণীর অঙ্গহানী করা যাবে না বা প্রাণীর ক্ষতিসাধন করা যাবে না।
ডা. জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, কুকুর নিধনের জন্য আমাদের একটা সেকশন ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কুকুরের কামড়ে আহত ব্যক্তিদের প্রতিষেধক (ভ্যাক্সিন) নেয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। সিসিক’র সহযোগিতায় শহীদ সামসুদ্দীন হাসপাতালে জলাতঙ্কের চিকিৎসা দেওয়া হয় বলেও তিনি জানান। কিন্তু সেখানে সাড়ে ৪ হাজারের মতো ভ্যাকসিন প্রয়োজন অথচ মিলে ২ হাজার। তাই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া কুকুর নিয়ন্ত্রণে সময়োপযোগী জনসচেতনতাও দরকার বলে জানান ডা. জাহিদ।
এর আগে পরিবেশবাদী ও পশুপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ ২০১২ সালে উচ্চ আদালত নির্বিচার কুকুর নিধনকে অমানবিক উল্লেখ করে তা বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কুকুরকে বন্ধ্যা (প্রজণনক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া) করে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। আর ২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইনের সপ্তম ধারা অনুযায়ী, মালিকবিহীন কোনো প্রাণীকে নিধন বা অপসারণ করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়।





