নির্বাচনী নিরাপত্তার নজিরবিহীন পরিকল্পনা
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ১১:০৮:৪৭ অপরাহ্ন
৯ দিন মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে সাজানো হবে দেশ

জালালাবাদ রিপোর্ট : নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে সরকার ও ইসি। এ নিয়ে রয়েছে একগুচ্ছ পদক্ষেপ।এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বাইরে অবৈধ অস্ত্র আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রয়োজনে বর্ডার ও সি-রুট সিল করা হবে। এছাড়া পুরো দেশকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন-এই তিন জোনে ভাগ করে সাজানো হবে নিরাপত্তা ছক।
জুলাই অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর রাতারাতি ভেঙে পড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। একদিকে মব সৃষ্টি, ছিনতাই-চাঁদাবাজির মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে মনোবল ভেঙে পড়া পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় অন্তর্বর্তী সরকার। তবে শতভাগ না হলেও এমন অবস্থা অনেকটা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়েছে। এমন অবস্থায় আগামী বছরের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে শনিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সব শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ৯ দিনের জন্য বিশেষ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। নির্বাচনের আগে পাঁচ দিন, নির্বাচনের দিন এবং পরে আরও তিন দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কঠোর অবস্থানে থাকবে। প্রয়োজন হলে দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়সীমা সমন্বয় করা হতে পারে বলেও তিনি জানান।
উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে ৩০ হাজার সেনা সদস্য মাঠে থাকলেও নির্বাচনের সময় তা বাড়িয়ে প্রায় এক লাখ করা হবে। এছাড়া প্রায় দেড় লাখ পুলিশ সদস্য, ৩৫ হাজার বিজিবি সদস্য, পাঁচ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য, চার হাজার কোস্টগার্ড সদস্য, আট হাজার র্যাব সদস্য এবং আনুমানিক সাড়ে পাঁচ লাখ আনসার সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তা জোরদারে আনসার সদস্যদের অস্ত্র ও বডি ক্যামেরা সরবরাহ করা হবে।
নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সন্দেহের সুযোগ নেই জানিয়েস্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে, রোজার আগেই অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণার পর লটারির মাধ্যমে প্রশাসনের রদবদল করা হবে। ইলেকশন খুবই শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আরও বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের মামলার রায় ১৭ নভেম্বর ঘোষণা হবে। এ জন্য দেশজুড়ে অতিরিক্ত সতর্কতা বজায় থাকবে, যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
সরকার পরিবর্তন প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ দেশে সরকার পতন কোনো তিনজন মানুষের কারণে হয়নি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই সরকার পরিবর্তন ঘটেছে। আপনারা দেখেছেন, তারা কীভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, তাদের আত্মীয়স্বজনও পালিয়েছে। এটি জনগণের ইচ্ছার ফসল।
ইসির পদক্ষেপ :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নয় দিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের কর্মপরিকল্পনা করেছে ইসিও। জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মূলত তিনটি পর্যায়ে কাজ করে থাকে। অর্থ্যাৎ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে, ভোটের সময় এবং ভোটের পরে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়গুলো তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হবে। ভোটের আগে চার দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পওে ৪ দিন মাঠে থাকবেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এবার এআইয়ের অপব্যবহার রোধ এবং ড্রোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা হয়েছে ইসির। ভোটের মাঠে পুলিশের সঙ্গে বডিওর্ন ক্যামেরাও থাকবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যে ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন, তার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’বলে প্রাথমিক তথ্য দেওয়া হয়েছে আইন শৃঙ্খলা সভায়।
কেন্দ্রে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনের সুবিধার্থে গত ২০ অক্টোবরের আইন শৃঙ্খলা সভায় একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। সেখানে আগের ৪২ হাজারের মত ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮,২২৬ টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২০,৪৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৩,৪০০টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের বিশেষ শাখা সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্রকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো, থানা থেকে দূরত্ব, কেন্দ্রের নিকটবর্তী প্রভাবশালীদের বাসস্থান ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, সীমান্তবর্তী ভোটকেন্দ্র, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা হয়েছে। ইসি বলছে, মাঠে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী কতদিন থাকবে, কোন ধরনের কেন্দ্রে কত জন করে দায়িত্বে থাকবে, এসব বিষয়ে প্রস্তাব এবং ম্যাপিং কমিশন সভায় চূড়ান্ত হবে।
ভোটকেন্দ্রের অবস্থান, প্রার্থীর বাসস্থানের দূরত্ব, গোলযোগের শঙ্কাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মহানগর এলাকায়, মহানগরের বাইরের এলাকা ও বিশেষ এলাকায় (পার্বত্য ও দুর্গম) সাধারণ ও ঝুঁকিপুর্ণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।মোতায়েনের ক্ষেত্রে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রগুলোকে ইসি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করে।





