ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে মুসলিম নির্যাতন চরমে
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ৯:০৪:৫১ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র, সবচেয়ে বড় সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দেশের ধর্মীয় সহনশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, বৈষম্য, মসজিদ ভাঙা, মুসলিম পাড়ায় বুলডোজার অভিযান, গণহত্যা-উদ্দীপক বলক্তৃতা, গণপিটুনি, গরু-সংক্রান্ত হামলা এবং নাগরিকত্ব ইস্যুকে কেন্দ্র করে দমন-পীড়ন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণ যত বেড়েছে, ঠিক ততটাই বাড়ছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অনাস্থা।
মুসলিমদের ওপর নির্যাতন এখন নিয়মিত ঘটনা: স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের ওপর হামলা এখন প্রায় নিয়মিত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটসহ বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমদের বাড়িঘর ভাঙা, দোকানপাট ধ্বংস, মুসলিম তরুণদের ওপর গণপিটুনি এবং সামাজিক বয়কটের ঘটনা আকারে ছোট-বড় অনেক ধরণের নিপীড়ন ঘটেছে।
গণপিটুনির ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়- গরু পরিবহন সন্দেহে, মাংস রাখার অভিযোগে বা কোনো সামান্য উত্তেজনাতেই মুসলিমদের লক্ষ্য করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। যেসব ঘটনাকে আগে “মব লিঞ্চিং” বলা হতো, এখন তা বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুরক্ষার ছায়ায় আরও বেপরোয়া।
মুসলিমদের জোর করে মূর্তির সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য করেন
ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে ক্রমবর্ধমান মুসলিম নিপীড়নের আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। কল্যাণ নামক মহারাষ্ট্রের একটি অঞ্চলে তিন মুসলিম ছাত্রকে জনসমক্ষে অপমানিত করা হয়েছে এবং একটি মূর্তির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম (হাতজোড় করে মাথা নিচু) করতে বাধ্য করা হয়েছে।
সম্প্রতি নির্জন একটি শ্রেণীকক্ষে ভুক্তভোগী মুসলিম শিক্ষার্থীদের নামাজ আদায় করার ভিডিও অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার পরই এমন ঘটনা ঘটে। গত ২৫ নভেম্বর কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস ও যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভি নিজ নিজ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিসের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, নির্জন একটি শ্রেণীকক্ষে নামাজ আদায় করার একটি ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের সদস্যরা স্থানীয় আইডিয়াল কলেজে ঢুকে পড়ে এবং ছাত্রদের ক্ষমা চাইতে এবং ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের মূর্তির সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করে। এ সময় পুলিশ সদস্যরা সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।
ভিডিও ফুটেজে জানা গেছে, আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের ঘিরে ধরে চরমপন্থি হিন্দুরা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় তাদেরকে হুমকি দেওয়া হয় এবং মূর্তির সামনে মাথানত করতে বাধ্য করা হয়।
স্থানীয় মুসলিমরা বলেছেন, এ ঘটনা বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে হয়রানির একটি ক্রমবর্ধমান ধারাকে প্রতিফলিত করে। এসব রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো কোনোরকম অভিযোগ ও বাছবিচার ছাড়াই নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং পুলিশ সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রদের অভিভাবকরা কলেজ প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা জনতার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। পাশাপাশি যে ছেলেরাই অপমানিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহি এবং ক্যাম্পাসে মুসলিম ছাত্রদের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দাবি করেছেন।
ভারতে গরু- কেন্দ্রিক সহিংসতা আবারও বাড়ছে, মুসলিমদের জীবন দুর্বিষহ: ভারতে বহু বছরের গরু-সংশ্লিষ্ট রাজনীতি নতুন করে এক ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে। গরুর মাংস রান্না করা, রাখা, গরু চোর সন্দেহ বা পরিবহনের অভিযোগে মুসলিমদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা এখন একটি স্থায়ী প্রবণতা হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণ ছাড়াই মুসলিমদের ওপর হামলা হয়- পরবর্তীতে দেখা যায়, অভিযোগ মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বছরের পর বছর ধরে এমন হামলা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার হয় না। হামলাকারীরা সামাজিক বা রাজনৈতিক সুরক্ষা পেয়ে যায়- যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের খোয়াই জেলার কারেঙ্গিছড়া এলাকায় গরু চুরির সন্দেহে তিন বাংলাদেশিকে যেভাবে গণপিটুনি ও তীর ছুড়ে হত্যা করা হয়েছে, তা সীমান্ত অঞ্চলে ভয়াবহ উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিহতরা-জুয়েল মিয়া (৩২), পন্ডিত মিয়া (৪৫) ও সজল মিয়া (২০)- সীমান্ত অতিক্রম করায় স্থানীয়রা সন্দেহ করে নৃশংসভাবে আক্রমণ করে। শুধু পিটুনি নয়, তীর মেরে হত্যা- এটি আধুনিক সময়ে বর্বরতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হতে যাচ্ছে, তবে বাস্তবতা হলো-গরু চোর সন্দেহে বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনা নতুন নয়। বহু বছর ধরেই একই অজুহাতে সীমান্তে গণপিটুনি, গুলিবর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় জনতার হাতে বিচার বা ‘মব জাস্টিস’ এখন সীমান্ত এলাকায় এক আতঙ্কের নাম।
গরু-কেন্দ্রীক উগ্রবাদ এখন শুধু সীমান্তেই নয়, ভারতের ভেতরেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। রাজস্থানের আজমিরে ২৬ এপ্রিল রাতে মসজিদের ভেতরে ঢুকে তিন মুখোশধারী হামলাকারীর হাতে ইমাম মুহাম্মাদ মাহিরের নির্মম হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ।
রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে হত্যা- এটি পরিকল্পিত ঘৃণামূলক হামলার ইঙ্গিত দেয়। ঘটনার সময় ১০-১৫ শিশু ছাত্র সেখানে উপস্থিত ছিল; তাদেরও হুমকি দেওয়া হয়। এখনো কাউকে গ্রেফতার না করায় স্থানীয় মুসলিমদের আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে গরুর মাংস রাখার অভিযোগে মুসলিম যুবকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও ফ্রিজে মাংস পাওয়া গেছে সন্দেহে ঘরে আগুন ধরানো হয়েছে, কোথাও রাস্তায় আটক করে গণপিটুনি, কোথাও দোকান ভাঙচুর করে মালিককে ‘গো-হত্যাকারী’ হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। যেসব ঘটনায় পরে মাংসটি গরুর নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে খুব কমই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মসজিদ ভাঙা ও বুলডোজার রাজনীতি: ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে একটি নতুন রাজনৈতিক ট্রেন্ড স্পষ্টভাবে নজরে এসেছে, তা হলো ‘বুলডোজার রাজনীতি’- বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান ও ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার ঘটনা। উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা- বেশ কয়েকটি রাজ্যে বুলডোজারকে এখন ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আইন-আদালতের পরোয়া না করে রাজনৈতিক নির্দেশনাতেই পরিচালিত হয় বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ। বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা বা সংঘর্ষের অজুহাতে মুসলিমদের বাড়িঘর, দোকানপাট, এমনকি শত বছরের পুরোনো মসজিদেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা বেড়েই চলেছে। হরিয়ানার নুহ-এ সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরপরই পুলিশি অভিযানে কোনো বিচারিক তদন্ত ছাড়াই মসজিদে বুলডোজার চালানো হয়। দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী, উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ ও কানপুরেও একই কায়দায় মুসলিম মালিকানাধীন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় না, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয় ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার’ নামে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই প্রক্রিয়াকে প্রকাশ্যে ‘প্রতিশোধমূলক অ্যাকশন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলছে, এটি প্রকৃত অর্থেই সংবিধান লঙ্ঘন, কারণ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ও আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান- এমন নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী এই আচরণ।
মসজিদ ভাঙা ও বুলডোজার রাজনীতি শুধু সংখ্যালঘুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করছে না, বরং ভারতের গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যে ধরনের একপেশে ‘শাস্তি’ দেওয়া হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর বিভাজন ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- মসজিদ ভাঙা বা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বুলডোজার অভিযান। প্রশাসনের দাবি- এগুলো ‘অবৈধ স্থাপনা’ বা ‘অবৈধ নির্মাণ’-এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ- এগুলো টার্গেটেড, পরিকল্পিত এবং স্পষ্টভাবে মুসলিম বিরোধী কার্যক্রম।
হরিয়ানায় সহিংসতার পর মসজিদ ভাঙা: সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর হরিয়ানায় বুলডোজার দিয়ে মুসলিমদের বাড়ি ও দোকান ভাঙার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের অভিযোগ- কোনো নোটিশ ছাড়াই রাতারাতি তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে মসজিদ ভাঙার ঘটনাও ঘটেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে- একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ হিসেবে বুলডোজার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের মূল ধারণার পরিপন্থী।
মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে একই ধারা: মধ্যপ্রদেশে একধিক মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরপরই। একই অভিযোগ উঠে- প্রশাসন কোনো তদন্ত ছাড়াই মুসলিমদের বিবেচিত করে “দোষী” হিসেবে ধরে তাদের সম্পত্তি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। উত্তর প্রদেশেও অনুরূপ দৃশ্য- মুসলিম পাড়ায় বুলডোজারের শব্দ যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হিজাব নিষেধাজ্ঞা ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ: কর্ণাটকের কলেজগুলোতে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব নিষিদ্ধ করা, স্কুলে প্রবেশে বাধা, পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধা- এসব ঘটনা মুসলিম নারীদের শিক্ষাজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আদালত বিষয়টি নিয়ে মতভেদ দেখালেও- ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ থামেনি।
মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়কে হেয় করা, ধর্মীয় পোশাক নিয়ে কটূক্তি, গণমাধ্যমে ঘৃণামূলক প্রচারণা- এসবও বর্ধিত ইসলামোফোবিয়ার প্রকাশ। রাজনৈতিক ভাষণে মুসলিমবিরোধী উস্কানি: ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে ঘৃণামূলক বক্তৃতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। নির্বাচনের সময় বা রাজনৈতিক সমাবেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উস্কানি, ভয় দেখানো, সন্দেহ তৈরি করা- এসব এখন নানাভাবে স্বাভাবিক করে তুলেছে।
রাষ্ট্রীয় কোনো পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও মাঝে মাঝে বিভাজনমূলক মন্তব্য শোনা যায়, যা সমাজে সহিংসতাকে উস্কে দেয় বলে অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।মিডিয়ায় মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা সমাজে বিভেদ বাড়াচ্ছে: ভারতের অনেক টেলিভিশন চ্যানেল, রাজনৈতিক শো ও ইউটিউব-ভিত্তিক মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, ভিন্ন সম্প্রদায়কে শত্রু হিসেবে তুলে ধরা- এসবের কারণে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে।
একে সমর্থন করছে সোশ্যাল মিডিয়া। ভুয়া খবর, গুজব, গরু-সংক্রান্ত ভুয়া ভিডিও, মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা- এসব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং হামলার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।কানুন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন: বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে- পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও সহিংসতা প্রতিরোধে উদ্যোগী হয়নি। এমনকি হামলাকারীরা ভিডিও লাইভ করেও হামলা চালিয়েছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে- মুসলিমরা আক্রান্ত হলেও উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। স্বজন হারানোর শোকে পরিবারের দাঁড়ানোর শক্তি থাকে না- তার ওপর আইনি হয়রানি তাদের আরও দুর্বল করে।
ভারতে মুসলিম নির্যাতন: ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন ও বৈষম্য আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বারবার ভারতের সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বাস্তবায়নের অভাব নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে। সংবিধান ুধিৎ সকল নাগরিককে ধর্মনিরপেক্ষ অধিকার দেয়, তবু বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুসলিমদের মৌলিক অধিকার নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সম্পত্তি ভাঙচুর, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক হীনপ্রচারণার ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও বিদ্বেষমূলক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে না আনা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। মুসলিমরা শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো শুধু প্রতিবেদন প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তারা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অবগত করছে যেন কার্যকর নজরদারি ও চাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ধর্মনিরপেক্ষ নীতি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তাহলে দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি সংকটাপন্ন হতে পারে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরও এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভারতের ভেতরের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘন বা সহিংসতা হলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত সরকারের দায়িত্ব হলো সংবিধানের মূলনীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা, ধর্মনিরপেক্ষ নীতি নিশ্চিত করা, এবং মুসলিমসহ সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করা। আন্তর্জাতিক মহলে এই চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে, যা ভারতকে জোরালো ও ত্বরিত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে।
ভারতের মুসলিমদের আর্তনাদ: সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর মুসলিমদের মনে প্রশ্ন- রাষ্ট্র কি তাদের পাশে আছে? যখন তাদের মসজিদ ভাঙা হয়, বাড়িঘর উড়িয়ে দেওয়া হয়, পুলিশ নির্বিকার থাকে বা উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করে- তখন সাধারণ মুসলিমরা বুঝতে পারেন না, কোথায় যাবে, কার কাছে ন্যায় চাবে!
অনেক মুসলিম পরিবার ভয়ে তাদের সন্তানদের নাম পরিবর্তন করছে, ধর্মীয় পরিচয় গোপন করছে। অনেক এলাকায় মুসলিমরা বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান রাতের বেলায় করতে ভয় পাচ্ছে। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে- ধর্মনিরপেক্ষ ভারত তার সংবিধানের মূল চেতনাকে কতটা হারিয়ে ফেলেছে।




