উর্ধ্বমূখী মূল্যস্ফীতির পারদ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩০:১৬ অপরাহ্ন
ডিসেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ, সংসার খরচের অস্বস্তিতেই বছর শেষ

জালালাবাদ রিপোর্ট : খাদ্যপণ্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার মধ্যে টানা দ্বিতীয় মাসের মত বেড়েছে মূল্যস্ফীতির হার। নভেম্বরের মতো ডিসেম্বরেও বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ডিসেম্বরে তা বেড়েছে হয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির এই অস্বস্তি নিয়েই শেষ হলো ২০২৫ সাল।
সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এই তথ্য প্রকাশ করেছে। গেল ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা নভেম্বর ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ ছিল। গ্রামীণ এবং শহরাঞ্চল উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতির হার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
মূল্যস্ফীতির এ হার দিয়ে বোঝায়, গত বছর ডিসেম্বর মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরের ডিসেম্বরে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৪৯ পয়সা। গতবছর জুলাই মাসে আন্দোলনের ধাক্কায় সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। তা কমতে কমতে চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ৩৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।
কিন্তু এরপর দুই মাস ধরে ফের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির সূচক। খাদ্যপণ্যের সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে, যা সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিবিএসের সবশেষ তথ্য বলছে, খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি নভেম্বর মাসের ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ডিসেম্বরে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ হয়েছে। নভেম্বর মাসে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ০৮ শতাংশ তা ডিসেম্বরে বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে।
ডিসেম্বরে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে যা নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। আর শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নভেম্বর মাসের ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। সেই লক্ষ্য পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদের উচ্চ হার ধরে রেখেছে। তবে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান আবার বাড়তে শুরু করেছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ায় খেটে খাওয়া মানুষের পকেটের ওপর চাপ বাড়লেও মজুরি হারের সূচকে কোনো সুখবর নেই। সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সেখানে ডিসেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। এর অর্থ হল, জীবযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না।
মূল্যস্ফীতি কীভাবে প্রভাব ফেলে :
মূল্যস্ফীতি একধরনের করের মতো। আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সে অনুযায়ী আপনার আয় না বাড়লে আপনাকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হবে। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। বিবিএস বলছে, গত ডিসেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এর মানে হলো, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়া মানে জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়া নয়। অন্যান্য মাসের তুলনায় ওই নির্দিষ্ট মাসে মূল্যবৃদ্ধি হয়তো কিছুটা কম হয়েছে, এটাই বোঝায়।উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাজার থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে যদি আপনার খরচ হয় ১০০ টাকা, পরের বছরের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ হওয়ার মানে হলো, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে; অর্থাৎ এক বছর পর একই পণ্য ও সেবা কিনতে আপনাকে ১০৮ টাকা ৪৯ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। প্রতি ১০০ টাকায় আপনার খরচ বেড়েছে ৮ টাকা ৪৯ পয়সা।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, কোনো পরিবারের যদি এক বছর আগে সংসার খরচ চালাতে ১ লাখ টাকা খরচ হতো। মূল্যস্ফীতির কারণে এ বছর ডিসেম্বর মাসে এসে ৮ হাজার ৪৯০ টাকা বেশি খরচ করতে হবে। এটি জাতীয় গড় হিসাব। তবে মূল্যস্ফীতির প্রভাব গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে।
দুই-তিন বছর ধরে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। অন্তর্র্বতী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এনবিআরও তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে দেয়। বাজারে নিত্যপণ্যের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়।





