সিলেটে ভোট ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:২০:০৫ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : রাত পোহালেই ভোট উৎসব। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সারাদেশের ন্যায় সিলেটেও ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এবারই প্রথম ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কাছে থাকছে বডি-অর্ন ক্যামেরা। র্যাব-পুলিশের পক্ষ থেকে আকাশে ড্রোন এবং বিজিবির পক্ষ থেকে থাকছে ডগ স্কোয়াডসহ নানা প্রস্তুতি। এদিকে বুধবার সকাল থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটের সরঞ্জাম পৌঁছানো শুরু হয়ে বিকেলে সমাপ্ত হয়। সকালে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের কাছে ভোটের সরঞ্জামাদি তুলে দেন। এরআগে মঙ্গলবার সকালেই প্রচার প্রচারণা সম্পন্ন হয়েছে।
সিলেট বিভাগের ৪ জেলার রিটার্নিং অফিসারদের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে মোট ১০৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আর বিভাগে মোট ভোটার ৭৮ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৩ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় মোট ভোটার ২৭ লাখ ১৫ হাজার ৩৩১ জন। সুনামগঞ্জে ১৯ লাখ ২২ হাজার ১৬৯ জন, হবিগঞ্জে ১৭ লাখ ১ হাজার ৭৪৫ জন, মৌলভীবাজারে ১৫ লাখ ১৬ হাজার ৫৮৮ জন ভোটার রয়েছেন। সিলেট জেলার ৬ টি আসনে মোট প্রার্থী হয়েছেন ৩৩ জন।
সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি ৪৫১টি এবং মৌলভীবাজারে ২২৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকছে ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’। কন্ট্রোল রুম থেকে এসব ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রের পরিস্থিতি লাইভ মনিটরিং করা হবে।
সিলেট জেলায় মোট ১ হাজার ১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নগরীর ২৯৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯৫টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। এসব কেন্দ্রে সংস্কার ও সীমানা প্রাচীর না থাকায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলার ৬৬৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫১টিই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে দুর্গম হাওরাঞ্চলে রয়েছে ১৫৭টি কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কঠিন হওয়ায় হেলিকপ্টারের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ জানিয়েছেন, প্রতিটি উপজেলায় ২ প্লাটুন বিজিবি এবং ১ হাজার ১০০ সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবে।
হবিগঞ্জ জেলায় ৬৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ, যার ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী জানান, প্রথমবারের মতো বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ১৭ প্লাটুন বিজিবি মাঠে রয়েছে। মৌলভীবাজার জেলায় ৫৫৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা পুলিশ সুপার মো. মনজুর রহমান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কোনো গোলযোগ হলে মোবাইল টিম যাতে ১-২ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাতে পারে, সেভাবে ফোর্স বিন্যাস করা হয়েছে।
নির্বাচনের দিন প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ২ জন পুলিশ ও ১৩ জন আনসার সদস্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৩-৪ জন পুলিশ ও ১৫ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল দল সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবে। সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, এবার সিলেটে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার প্রচারণা সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশা করছি নির্বাচনও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, সিলেট জেলায় মোট ভোট কেন্দ্র আছে ১০১৬টি। বুধবার সকালে এসব কেন্দ্রে ভোটের সরঞ্জামাদি প্রেরণ করা হবে। নগরে সিলেট ক্রীড়া কমপ্লেক্স থেকে সকালে সরঞ্জামাদি প্রেরণ শুরু হবে। জেলা প্রশাসক বলেন, সিলেটে চারশ’র অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। এবার ভোটের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবিসহ সর্বোচ্চসংখ্যক ফোর্স নিয়োজিত রয়েছে। অতীতের কোন নির্বাচনে এতো ফোর্স ছিলো না। এছাড়া ড্রোন ক্যামেরা থাকবে। ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছেন। আমরা আশা করছি যেকোন মূল্যে একটা সুন্দর নির্বাচন করতে পারবো।
র্যাব-৯ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার তাজমিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেটে সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো হুমকি বা ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছে র্যাব-৯।
তিনি বলেন, যৌথবাহিনীর অভিযানে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে সংখ্যালঘু ও চা শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ভোটের দিন কোন অভিযোগ থাকলে কেন্দ্রে যোগাযোগ করলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেনে র্যাব। সিলেটে ৫৫০ জন র্যাব সদস্য ভোটের দিন মাঠে থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের পাশাপাশি স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন থাকবে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট।
এছাড়া নির্বাচনে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ৫৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নগরীর ২৯৪টি ভোটকেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রয়েছে। ভোটারদের আশ্বস্ত করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
এসএমপির ৭ নির্দেশনা : এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সিলেট মহানগর পুলিশ সাত নির্দেশনা জারি করেছে। পুলিশের এই নির্দেশনা যথাযথ পালন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে কেউ পুলিশের নির্দেশনা না মানলে তার বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর আইনী ব্যবস্থা। অপরদিকে, ভোটের দিন থেকে শুরু করে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (ভোটের পর দুই দিন) মাঠে তৎপর থাকবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, অপরাধ প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এসব তথ্য নিশ্চিত করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী। পুলিশের নির্দেশনা হচ্ছে, কোন নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার অন্য কোন নির্বাচনী এলাকার কোন ভোটকেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে কোন ভোটারকে অন্য কোন নির্বাচনী এলাকার ভোটকেন্দ্রের আশপাশে পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে নেয়া হবে আইনী ব্যবস্থা। এছাড়া কোন ভোটারকে কোন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী ভোটকেন্দ্রে যেতে বাঁধা দেয়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে নেয়া হবে কঠোর আইনী ব্যবস্থা। ভোট দেয়ার পর ভোটকেন্দ্রের আশপাশে না থাকার জন্য ভোটারদের অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ। অনুমোদন বিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষেধ। সেই সাথে নির্বাচনী আইন অনুসারে ভোটারদের মুখমন্ডল প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়ম মোতাবেক মুখমন্ডল প্রদর্শন না করে পরিস্থিতি ঘোলাটে কিংবা ভোটের লাইনে সৃষ্টি করা যাবে না।
একই সাথে উস্কানিমূলক কোন বক্তব্যে কান না দেয়ার পাশাপাশি যাচাই বিহীন কোন তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার না করা। ভোটের দিন সন্দেহভাজন কোন ব্যক্তি, বস্তু বা পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে সাথে সাথে পুলিশ, নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করা। সেই সাথে নির্বাচনকালিন সার্বক্ষনিক নাগরিক সুরক্ষা পেতে সিলেট মহানগর পুলিশের জরুরী সেবা জিনিয়াএ অ্যাপ ব্যবহার করা অথবা হটলাইন নাম্বার ০১৩৩৯-৯১১৭৪২ সরাসরি ফোন করা।
শেষ সময়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে সিলেটে কোন অপ্রতীতিকর ঘটনা না ঘটলেও শেষ মুহূর্তে এসে বিএনপি ও জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠছে। প্রেস ব্রিফিং করে এবং লিখিতভাবে এসব অভিযোগ দেয়া হচ্ছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে সিলেট-১ আসনের জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকেও সিলেট-১ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও নেতাকর্মী কর্তৃক এজেন্টদের হুমকী-ধামকীর অভিযোগ দেয়া হয়েছে। বোরকা নিয়ে সিলেট-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে পর্দা অবমাননার অভিযোগ তুলেছে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট।





