সরকারের ১ মাস
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৯:১৬ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। ফলে এই এক মাসে সরকারের দিক থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বা যেসব পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে তা কী বার্তা দিচ্ছে- এই আলোচনাও হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা খাল খনন কর্মসূচি শুরুর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়গুলো যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি দলের সমর্থক এক ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে সমালোচনাও আছে।
নির্বাচনের আগে থেকেই চাঁদাবাজির অভিযোগে প্রতিপক্ষের দিক থেকে তীব্রভাবে সমালোচনার মুখে থাকা বিএনপি সরকারের গঠনের পরেও এটিকে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে সেই প্রশ্নও আছে। সমালোচনা হয়েছে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়েও।
এছাড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে সিটি কর্পোরেশন ও ৪২ জেলায় দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগের মতো দলের সমর্থক শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
সরকারের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সরকারের প্রথম ২৮ দিনের ২৮ পদক্ষেপ প্রকাশ করে একে ‘এক অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি এসব পদক্ষেপ ‘সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের প্রতিটি অঙ্গনকে আলোকিত করেছে’।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করে।
এর আগে ২০২৪ সালের অগাস্টে গণআন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
নির্বাচনের আগে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন প্রায় সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা তারেক রহমান।
সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, সরকার গঠনের পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং এজন্য এবার একশ দিনের পরিবর্তে ১৮০ দিনের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠক শেষে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সরকারের প্রথম দিন একটা কেবিনেট মিটিং করতে হয়। আমরা সবাই বসেছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন, কিছু অনুশাসন দিয়েছেন। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। আমরা এবার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছি।
যদিও সেই ১৮০ দিনের পরিকল্পনা কোন কোন বিষয় থাকছে তা এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে নির্বাচনের আগে থেকেই আলোচিত ইস্যু ছিল ফ্যামিলি কার্ড। নির্বাচনী প্রচারেও এটি ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে নারীপ্রধান পরিবারের নামে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন।
এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন উপকারভোগীকে এই ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের চার কোটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুপ করা হয়েছে এবং প্রায় ২৭ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম দ্রুতই শুরু হচ্ছে।
বিএনপির আরেকটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি দলীয় ও সরকারিভাবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন।
অর্থনীতিবিদ অর্থনীতিবিদ ডঃ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। সামাজিক সুরক্ষায় দরিদ্ররা স্বস্তি পাবে। কিন্তু বিনিয়োগ চাঙ্গা করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো না গেলে ঋণ ফাঁদে পড়তে হবে। বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। দেখতে হবে সরকার বাজেটে এসব বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।
এদিকে, সরকার ১১টি সিটি কর্পোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদের দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বায়ত্ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়তে ৭৩র অধ্যাদেশ না মেনে দলীয় শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছে সরকারি আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, দলীয়করণের কারণেই স্থানীয় সরকারগুলো ধ্বংস হয়েছে এবং এই সরকারও সেখানে নির্বাচন না করে প্রশাসক বসিয়েছে।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনও শুরু হয়েছে এবং সেই অধিবেশনের প্রথম দিন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য শেষ দিন ছিল গত ১৫ই মার্চ। সেদিনই সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমান বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।
জবাবে সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ করতে হলে আগে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে ।
কিন্তু সেটি সংসদের চলতি অধিবেশন কিংবা এর পরবর্তী অধিবেশনেও করা সম্ভব হবে কি-না তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।




