আজ মহান স্বাধীনতা দিবস : মুক্তি-সংগ্রামের অগ্নিঝরা সেই দিন
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ মার্চ ২০২৬, ৩:৪১:২৪ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : বছর ঘুরে আবার এলো মুক্তি-সংগ্রামের অগ্নিঝরা সেই দিন। বীরের রক্তস্রোত আর লাখো মায়ের অশ্রুমিশ্রিত স্বাধীনতার গৌরবদীপ্ত দিন। আজ মহান স্বাধীনতা দিবস।
স্বাধীন বাংলাদেশ আজ পা রাখলো ৫৬ বছরে। কিন্তু অন্য যে কোনো দিনের চাইতে আজকের ভোরের আলোতে যেন বেশি মায়া মাখানো। যেন নতুন স্বপ্নের কথা বলছে। বলছে, সামনের দিনগুলোতে অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে শুভময়তা ছড়িয়ে যাবে দেশময়। গণতন্ত্রের আশাজাগানিয়া সূর্যকিরণ যেন সে দ্যুতিই ছড়িয়ে দিচ্ছে সবার প্রাণে, মনে।
এবারের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগেই একটি অর্থবহ নির্বাচনে দেশে আবার গণতন্ত্রের সূর্যোদয় হয়েছে। সহিংস রাজনীতির অশুচি কাটিয়ে পূর্বদিগন্তে শাশ্বত সেই সূর্যেরই উদয়ন হয়েছে নতুন সৌন্দর্যের আবহন ঘটিয়ে।
রক্তঝরা এক গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নয়া আঙ্গিকে এবার উদ্যাপন হতে যাচ্ছে মহান স্বাধীনতা দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২৪ এর আন্দোলনে সকল শহীদদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার প্রত্যাশায় পালিত হবে দিবসটি।
দীর্ঘ বছর পর মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আজ সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ও ফ্লাই পাস্ট। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও আমীরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকল বাংলাদেশিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
একাত্তরের এই দিনেই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতা দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তদানীন্তন শাসককোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্খা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। ক্ষুধা-দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও দুঃশাসন মুক্ত একটি দেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বস্তরের জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে আজকের এই দিনেই দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল।
একটি নতুন পতাকা, একটি ভয়াবহ কালরাত-সবমিলিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চকে ধরা হয় বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বের সূচনা হিসেবে। এ মাসেই বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। একাত্তরে পুরো মার্চ মাস ছিল উত্তাল। বাংলা ছিল অগ্নিগর্ভ। দেশ জুড়েই স্লোগান আর স্লোগান। এরপর ২৬ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় মানুষ পেয়েছিলো মুক্তির প্রেরণা।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১ মার্চ। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলার মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকা যেন আগ্নেয়গিরি। বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ থেকে ছাত্ররা বের হয়ে আসে। জনতা ছুটে আসে রাজপথে, পল্টন ময়দান যেন জনসমুদ্র। চারদিকে জনস্রোত।
এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সাথে সাথে দর্শক খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে হাজারো মানুষ পল্টন-গুলিস্তানে বিক্ষোভ শুরু করে দিয়েছে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। ২৭ মার্চ কালুঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। এরপর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের।
বাংলাদেশের বয়স আজ ২৬ মার্চ ৫৬ বছরে পদার্পণ করবে। মানুষের জীবনের হিসাবে ধরলে প্রৌঢ়ত্ব এসে গেছে। যেহেতু এটি দেশের হিসাব, তাই প্রৌঢ় বলা যাবে না, নবীনই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের গতিপথ বারংবার পাল্টে যায় বলে সরলরেখায় চলে না। সে কারণে একে জন্ম থেকে অদ্যাবধি প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করা কঠিন। রাষ্ট্র মাঝেমধ্যে স্থবির হয়ে পড়ে। সে অগ্রসর হয় না; বরং অনেক সময় পেছন দিকে ধাবিত হয়।
তবে এবার নতুন আশায় বুক বেঁেধছে জাতি। গত ১৫ বছর ধরে নির্বাচন ও গণতন্ত্র অনেকটা প্রহসনে রূপ নিয়েছিলো। সেই আক্ষেপ ঘুচেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারী। একটি অবাধ ও নিরপক্ষে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছে।
এখন সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথচলা নিশ্চিত করা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সংহত করা। আর এটিই হচ্ছে স্বাধীনতার মূল চেতনা।




