অবশেষে থামছে যুদ্ধ! আমেরিকা-ইরান ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ৩:২৪:১০ অপরাহ্ন
‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলছে ইরান, রাজপথে উল্লাস
বিশ্ব শান্তির জন্য বড় একটি দিন বললেন ট্রাম্প
আগামীকাল ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিক আলোচনা
স্টাফ রিপোর্টার : শঙ্কা-উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মেঘ উড়িয়ে অবশেষে যুদ্ধবিরতি। ৪০ দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য পুড়ছিল যুদ্ধের আগুনে। শেষপর্যন্ত সংঘর্ষবিরতিতে রাজি ইরান এবং আমেরিকা। যদিও এই যুদ্ধবিরতি আদৌ টিকবে কিনা বলা যাচ্ছে না। তবু আপাতত যে যুদ্ধ থামার পরিস্থিতি তৈরি হল তা অভাবনীয়। কেননা মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোটা ইরানর সভ্যতা’ ধ্বংসের দাবি ঘিরে চাঞ্চল্যের পারদ তুঙ্গে পৌঁছেছিল।
এ যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানিয়েছে ইসরায়েলও। এই খবরে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম।
এর আগে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে যদি ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে না-দেয় তবে তেহরানকে নরকে পাঠানো হবে। তবে শেষ পর্যন্ত পিছু হটলেন ট্রাম্প। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করলেন তিনি।
যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে ‘অক্লান্ত পরিশ্রমের’ জন্য তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরাগচির সেই বার্তাটি নিজের মালিকানাধীন ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শেয়ার করেছেন, যা শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রতি ওয়াশিংটনের সম্মতিরই ইঙ্গিত দেয়।
যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহবাজ শরীফ। তবে ইরানও ১০টি শর্ত দিয়েছে। ফলে অবিলম্বেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে ।
শাহবাজ শরিফ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে আগামীকাল শুক্রবার ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেখানে সব বিরোধের একটি চূড়ান্ত এবং মীমাংসিত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির সামরিক বাহিনীকে গুলি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা আলোচনায় বসছে ওয়াশিংটনের প্রতি ‘চরম অবিশ্বাস’ নিয়ে। শত্রুপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, ‘আমাদের হাতের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধে নিজেদের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ অর্জনের দাবি করেছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল। বুধবার এক বিবৃতিতে এ দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক আলোচনার আগেই ১০ দফার একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে বাধ্য করেছে ইরান।
ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তার বিস্তারিত সামনে এসেছে। এই প্রস্তাবগুলোতে ইরান কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ১০ দফা পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো-হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার, মিত্র শক্তির নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ মুক্তি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা।
ওদিকে, ইরান যুদ্ধে ‘বিজয়’ দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এক বিবৃতিতে এ খবর জানান।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্ব শান্তির জন্য আজ বেশ বড় একটি দিন!। ইরানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির কথা জানানোর পর বুধবার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ কথা বলেন।
পোস্টে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরান চায় এটা (যুদ্ধবিরতি) ঘটুক, তারা আর সহ্য করতে পারছে না! একইভাবে অন্যরাও পারছে না!
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-দুপক্ষই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবরে রাজপথে নেমে উল্লাস করেছেন ইরানের রাজধানী তেহরানের বাসিন্দারা। স্থানীয় সময় বুধবার ভোরে তেহরানের পথে পথে মিছিল হয়েছে, স্লোগান হয়েছে। যুদ্ধ আপাতত থেমে যাবে, এমন সম্ভাবনায় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে তেহরানের বাসিন্দাদের মধ্যে।
ট্রাম্পের সামনে ভালো কোনো বিকল্প ছিল না:
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আসা ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ‘ভালো কোনো বিকল্প’ ছিল না। এমন মন্তব্য করেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক নীতি বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সি।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ত্রিতা পার্সি বলেন, পরিস্থিতি অনেকটা এমন ছিল যে ট্রাম্প এই চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে পোপ চতুর্দশ লিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরল সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ মুছে ফেলার হুমকি দেওয়াটা ‘সত্যিই অগ্রহণযোগ্য’।





