প্রেরণার বাতিঘর: অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী (রহ.)
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জুন ২০২৬, ৭:২৫:৪১ অপরাহ্ন
মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার
অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী (রহ.)! আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। সাবেক এমপি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সাবেক সদস্য ও সিলেট জেলা শাখার সাবেক আমীর। দক্ষ সংগঠক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গিয়েছেন। অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ১২ জুন ২০২৬, শুক্রবার দিবাগত রাতে দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করেছেন। ১৩ জুন, শনিবার বিকেলে তাঁর নিজ এলাকায় স্ব-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামেয়া ইসলামিয়া ইউসুফিয়া আলিম মাদরাসা, তালবাড়ি, কানাইঘাট, সিলেটের ময়দানে জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদরাসা পাঠানটুলা, সিলেটে অধ্যয়নরত অবস্থায় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। জামেয়ার একাডেমিক উন্নয়ন, এমনকি সার্বিক অগ্রগতিতে তিনি অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। রেকটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলো হৃদয়পটে বারবার ভেসে ওঠছে। তাঁর স্নেহ মমতার ঋণ কখনোই শোধ করার মতো নয়।
তখন আমি অনেক ছোট। সুনামগঞ্জ শহরে আমাদের বসবাস। পড়াশোনা করি দ্বীনি সিনিয়র মাদরাসায়। একটি অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে আলোচনা পেশ করবেন। আমাদের একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, প্রোগ্রামে এমন এক ব্যক্তি আসবেন, যার এক মিনিটের কথাবার্তা আমাদের কমবেশি ২০ মিনিটের কথা থেকেও মূল্যবান। তিনি অতি দামী কথা বলে থাকেন। আমরা অবাক হয়ে শিক্ষকের কথাগুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, এমন মহান ব্যক্তির কথা শুনা, তাঁর সাহচর্য পাওয়াতো সৌভাগ্য ব্যাপার। আমার মরহুম আব্বাজান এডভোকেট আব্দুর রউফের সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিলো।
শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বারবার কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছে। অসংখ্যবার সফরসঙ্গী হিসেবে সাথে ছিলাম। ২০০১-২০০৬ সালে এমপি থাকাকালীন সময় এমপি হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেয়েছি। সিলেটে একটি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। এই কাজে সফরসঙ্গী হিসেবে ঢাকাতে যাওয়া হয়েছে। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় দুইবার নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছি। দু’বারে প্রায় ৬ মাস অবস্থান করার সৌভাগ্য হয়েছে। কানাইঘাট-জকিগঞ্জের মানুষ তাঁকে কতটা ভালোবাসে, কাছ থেকে দেখেছি।
অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের তালবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল ও সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রজীবনে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী ইসলামী ছাত্রসংঘের সিলেট জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলার আমীর, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শুরা’র সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসন থেকে চার দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট সহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকান্ডে তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি সিলেট নগরীতে বেশ কয়েকটি শিক্ষা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নেপথ্যে ছিলেন।
আশির দশকে তাঁর নেতৃত্বেই সিলেটে প্রথম জামেয়া ইসলামিয়া মিরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দি সিলেট ইসলামিক সোসাইটি, শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদরাসা ও আল-আমিন জামেয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু নগরীতেই নয়, নিজ গ্রাম তালবাড়িতেও তিনি পৈতৃক সম্পত্তিতে ফাজিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে কাজ করে গেছেন। সামাজিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থেকে তিনি ‘আনজুমানে খেদমতে কুরআন’ নামক সংস্থা গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এছাড়া তিনি নগরীর আল-হামরা শপিং সিটির অন্যতম উদ্যোক্তা ও ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
সম্মানিত শিক্ষকের চারিত্রিক সৌন্দর্যের দিকগুলো বিস্তারিত না হলেও অল্প আলোকপাত করতে চাই। যা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। নিঃসন্দেহে আমরা উজ্জীবিত হবো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘‘তোমরা বেশি হেসো না। কারণ, বেশি হাসলে একদা অন্তরখানা নিস্তেজ প্রাণহীন হয়ে যায়’’। (তিরমিযী : ২৩০৫; ইবনু মাজাহ্: ৪২৬৮)। অধ্যক্ষ ফরীদ চৌধুরী (রহ.) খুবই কম হাসতেন। মাঝেমধ্যে মুচকি হাসি তাঁর মুখে শোভা পেতো। তিনি কম কথা বলতেন। আস্তেধীরে কথা বলা পছন্দ করতেন। প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বেহুদা গল্প তিনি মোটেও পছন্দ করতেন না। মু’মীনের অনন্য গুণ হলো অযথা কথা না বলা। আল্লাহর বাণী: আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। (সূরা আল-মু’মিনুন: ৩)।
আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। (সূরা আল-ফুরকান: ৬৩)। অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে নম্রতা সহকারে চলাফেরা করে। হাউনুন শব্দের অর্থ এখানে স্থিরতা, গাম্ভীর্য, বিনয় অর্থাৎ গর্বভরে না চলা, অহংকারীর ন্যায় পা না ফেলা। অহংকারের সাথে বুক ফুলিয়ে চলে না। গর্বিত স্বৈরাচারী ও বিপর্যয়কারীর মতো নিজের চলার মাধ্যমে নিজের শক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা না করা। বরং তাদের চালচলন। হয় একজন ভদ্র, মার্জিত ও সৎস্বভাব সম্পন্ন ব্যক্তির মতো। অধ্যক্ষ ফরীদ চৌধুরী (রহ.)-এর চলাফেরা ওঠাবসায় এর বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যেতো।
সামাজিক কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। জানাযায় অংশগ্রহণ তাঁর অনন্য ও স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিলো। তিনি বিরুদ্ধবাদী লোকের জানাযায়ও শরীক। অগণিত জানাযায় ইমামতি করেছেন। আমাদের জানামতে, বৃহত্তর সিলেটে জানাযায় এতো বেশী ইমামতির সুযোগ খুব কম লোকই পেয়েছেন। সুখে-দুঃখে পাশে থাকা তাঁর বিশেষ একটি গুণ। প্রতিবেশী কিংবা এলাকাবাসী এর বাস্তব সাক্ষী। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিযি : ১৯৪৪)।
তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়াত প্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন। সূরা (আন-নাহল: ১২৫)। তিনি ছিলেন একজন দাঈ ইলাল্লাহ। প্রকৃত দাঈ ইলাল্লাহ। প্রজ্ঞার সাথে লোকদেরকে দ্বীনের পথে ডাকতেন। আবেগ ও বিবেকের সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করতেন। আমাদেরকে মাঝেমধ্যে পরামর্শ দিতেন। নিজেও তাঁর কাছ অনেক উপদেশ পেয়েছি। আবেগী কথাবার্তার পাশাপাশি চিন্তাভাবনার খোরাক দেয়ার ব্যাপারে তিনি গাইডলাইন দিতেন।
তিনি ছিলেন ভালো একজন এমপি। মেপে মেপে কথা বলতেন। টু দ্যা পয়েন্ট কথা বলা পছন্দ করতেন। একবার জামায়াতের একজন গুরুত্বপূর্ণ এমপিকে উদ্দেশ্যে করে স্পিকার বললেন, সংসদ সদস্য, চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে আপনি ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী সাহেবকে ফলো করে কথা বলতে পারেন।
নিশ্চয় যারা বলে, ‘আল্লাহই আমাদের রব’ অতঃপর অবিচল থাকে, ফেরেশতারা তাদের কাছে নাযিল হয় (এবং বলে,) ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর তোমাদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল। (সূরা হা-মীম আস-সাজদাহ : ৩০)। ব্যক্তিগতভাবে আমি শ্রদ্ধেয় উস্তাযের মধ্যে এই আয়াতের আমল দেখেছি। এর সাক্ষী তাঁর কাছের মানুষেরা। কঠিন সময়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ফ্যাসিস্টরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। যুদ্ধাপরাধী বানানোর পায়তারা করেছে। মামলা দিয়েছে। তাঁর মনোবল দুর্বল করতে পারে নি। তিনি সত্যের পথে অবিচল ছিলেন। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিলেন।
শ্রদ্ধেয় উস্তাযের বিদায়ে হৃদয়ে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করছি। তাঁর স্মৃতিগুলো আজীবন অমলিন রয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ। সবার কাছে দোয়া চাই। নিজেও দোয়া করি। ইয়া রাব্বাল আলামীন! শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকে ক্ষমা ও জান্নাতুল ফিরদাউসের আ’লা মাক্বাম দান করুন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং দ্বীনের পথের সহযাত্রীদের সাবরে জামিল ও হায়াতে তাইয়্যিবাহ দান করুন। হেফাযতে রাখুন। আমীন।।

লেখক: সহকারী জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন।




