ইরান যুদ্ধে সেই ‘ম্যাডম্যান থিওরি’
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ৩:১২:১৪ অপরাহ্ন
আজ আলোচনা, নজর পাকিস্তানে
স্টাফ রিপোর্টার : ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হুমকি তো বটেই, কথার ফুলঝুরি ফুটেছে ট্রাম্পের মুখে। দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটলেও হুমকি থামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের। ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের এই নীতির মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ছায়া দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইরানকে চাপে ফেলতে ঐতিহাসিক সেই ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ কাজে লাগিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধবিরতি সম্পন্ন হয়েছে ঠিকই তবে এক সপ্তাহ পিছনে ফিরলে দেখা যাবে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে রবিবার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ঘৃণ্য ভাষায় ইরানকে গালিগালাজ করার পাশাপাশি হুমকি দেন তেহরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার। ইরান সেই হুমকিতে বিশেষ সাড়া না দিলেও ট্রাম্প থামেননি। জারি থাকে তাঁর শাসানি। এই হুমকি হুঁশিয়ারির মাঝেই সম্পন্ন হয় যুদ্ধবিরতি। শত্রুকে পাগলের মতো ভয় দেখানোর এই নীতিকেই আন্তর্জাতিক পরিভাষায় বলা হয় ‘ম্যাড ম্যান থিওরি’।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার এই নীতি নতুন নয়। বিশ্বের ইতিহাসে এই তত্ত্বের কথা প্রথম সামনে এসেছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এই তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন, শত্রুকে লাগাতার ভয় দেখাতে হবে। প্রয়োজনে পরমাণু হামলার হুমকি দিতে হবে। বিশ্বের সামনে নিজেকে একজন ‘উন্মাদ’ হিসেবে তুলে ধরতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার ও আয়াতোল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ঠিক এই নীতিই নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের ‘সভ্যতা ধ্বংস’ থেকে তাঁকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানোর হুঁশিয়ারি দেন।
লন্ডন স্কুল অব ইনিমিক্সের অধ্যাপক পিটার ট্রুবোয়িটজ বলেন, এই ধরনের উন্মাদ আচরণকে নিজের কৌশলগত ও রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানের মতো আদর্শিক প্রশাসন এই ধরনের হুমকিতে ভয় পায় না, উল্টো আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এর প্রমাণ দিয়েই যাচ্ছে ইরান।
এদিকে, এই যুদ্ধবিরতি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সেই সব বেসামরিক নাগরিকদের জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে, যারা ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে লাগাতার হামলার মধ্যে ছিল।
তবে লেবাননের জনগণকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করে সেখানে বড় পরিসরে প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে যুদ্ধবিরতির স্বস্তির মাঝে শঙ্কাও জেগেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যুদ্ধবিরতি থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। তেহরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লেবানন ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকাকে তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এর ফলে আলোচনাগুলো অর্থহীন হয়ে যাবে। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান লেবাননের জনগণের সঙ্গেই থাকবে।
এতসব নাটকীয়তা ও হুমকির মাঝেই ইরানি প্রতিনিধি দল আলোচনার জন্য পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আজ শুক্রবার সেখানে বহুল প্রতীক্ষিত এই কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী অবস্থান এবং অন্যদিকে ইরানের শান্তি প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি- সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ বৈঠক এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই আলোচনা ইরান প্রস্তাবিত ১০ দফার ভিত্তিতে হবে। তবে দফাগুলো ঠিক কী কী, তা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে।
ইরানিরা বিশ্বাস করে যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি শক্তির বিরুদ্ধে তাদের শাসকগোষ্ঠীর দৃঢ়তা ও প্রতিরোধ, পাশাপাশি এখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করতে পারা এবং ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা আমেরিকাকে তাদের দশ-দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতে আলোচনায় আসতে বাধ্য করেছে।
এই পরিকল্পনায় এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন, ঠিক যেমন ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো মেনে নেওয়া কঠিন।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা।
দুই পক্ষ ইসলামাবাদে গেলে পাকিস্তান একটি স্থায়ী চুক্তি করাতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এই যুদ্ধ ও এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে।




