ইরান-আমেরিকার যুদ্ধবিরতি : আলোচনায় ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ পদ্ধতি
প্রকাশিত হয়েছে : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২:১৯:৫২ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার : আজ শনিবার থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বসতে চলেছে ইরান-আমেরিকার মধ্যে শান্তি আলোচনা। তার আগে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা ইসলামাবাদ। মোতায়েন করা হয়েছে হাজার হাজার পুলিশ এবং সেনা সদস্য। শুধু তা-ই নয়, সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কুল-কলেজ এবং বাজার।
জানা গেছে, ‘রেড জোন’ এলাকাগুলিতে অর্থাৎ যেখানে রয়েছে সংসদ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয়, বিলাসবহুল হোটেল এবং দূতাবাস সেখানে বেসরকারি যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দু’দেশের প্রতিনিধিরা যাতে নির্বিঘ্ন যাতায়াত করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে শহরজুড়ে বেশ কয়েকটি চেক পয়েন্ট বসানো হয়েছে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা উপস্থিত থাকবে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। গোটা শহরের যান চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
‘গালফ নিউজে’র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদে এসেছে ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল। আমেরিকা-ইরানের বৈঠকের আগে নিজেদের আকাশ সীমাও সুরক্ষিত করছে ইসলামাবাদ। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের আকাশে টহল দিতে দেখা গেছে আইএল-৭৮ রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার এবং পাক যুদ্ধবিমান সি-১৩০।
শুক্রবার ইরানের আকাশেও দেখা গেছে পাক যুদ্ধবিমান। ইরানের প্রতিনিধি দলকে নিরাপত্তা দিতেই যুদ্ধবিমানগুলি সেখানে পাঠানো হয়েছে। ইসলামাবাদ সফরকালে ইরানের প্রতিনিধিদলের উপর যাতে কোনও রকম হামলা না হয়, তা নিশ্চিত করবে পাকিস্তান। তাঁদের ঢাল হয়ে দাঁড়াবে পাক যুদ্ধবিমানগুলি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। এই আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের।
অন্যদিকে, তাসনিম নিউজ’ এক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে এই খবরটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সূত্রটি জানিয়েছে, ‘কিছু সংবাদমাধ্যমে ইরানি প্রতিনিধি দলের ইসলামাবাদ পৌঁছানোর যে খবর প্রচার হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
ইরানের উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি বলেছেন, তারা এমন যুদ্ধবিরতি চায় না, যা শত্রুকে আবার ইরানে হামলা চালানোর সুযোগ দেবে।
তেহরানে আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক বৈঠকের সময় ইসলামাবাদে আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বিষয়ে তিনি এ মন্তব্য করেছে।
ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি এ কথা জানিয়েছে। উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী মাজিদ তাখত বলেন, ইসলামাবাদে আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে ইরানের দেওয়া ১০ দফা পরিকল্পনাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ইরান সবসময় কূটনীতি এবং সংলাপকে স্বাগত জানায়। তবে তা এমন কোনো সংলাপ নয়, যা মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে করা হয়। কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক আগ্রাসনের পথ সুগম করার লক্ষ্যে করা হয়।
উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন যুদ্ধবিরতি চাই না যা আক্রমণকারী শত্রুকে পুনরায় সজ্জিত হয়ে আবার আক্রমণ করার সুযোগ দেয়। আমরা বন্ধুদের (মধ্যস্থতাকারী) স্পষ্ট জানিয়েছি।’
যেভাবে হতে পারে আলোচনা?
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে অবস্থান করবেন এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তারা দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবেন। বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পৃথকভাবে দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলেও জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদ্ধতি সাধারণত তখনই ব্যবহৃত হয় যখন দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থা অত্যন্ত কম থাকে, যা এই সংঘাতের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।
এদিকে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হওয়া এ হামলা যুদ্ধবিরতিকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধানের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এদিকে, আলোচনার আগের দিন ইসরায়েল ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।
খাজা আসিফ ইসরায়েলকে ‘অশুভ এবং মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে উল্লেখ করে বলেন, যখন শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া চলছে, তখন লেবাননে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, প্রত্যাশা এবং একইসঙ্গে শঙ্কা। তবে আজ দিনের শেষে হয়তো মিলবে আশার বার্তা, নয়তো হতাশা!




