সিলেটে নগরের ৭ ফোয়ারার চারটির অস্তিত্ব নেই : ৩টি পরিত্যক্ত
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২:১৭:৪১ অপরাহ্ন

মামুন পারভেজ :
সিলেট নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে নির্মিত সাত ফোয়ারার চারটির অস্তিত্ব নেই আর তিনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে| নগরের বিভিন্ন মোড়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ফোয়ারাগুলো নির্মাণ করা হয়| নির্মাণের পর গত দুই দশকে কয়েক দফা সিলেট সিটি করপোরেশন কয়েকটি ফোয়ারা মেরামত করলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো ফের নষ্ট হয়ে পড়েছে| নষ্ট হয়ে পড়ে থাকায় আবর্জনা জমে এগুলো এখন উল্টো সৌন্দর্যহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
জানা যায়, নগরের সৌন্দর্য ও শোভাবর্ধনের জন্য ২০০৩ সালে বিভিন্ন পয়েন্টে চত্বর নির্মাণ করা হয়| এসব চত্বরের ছয়টিতে কৃত্রিম ফোয়ারা সংযোজন করা হয়| একই সঙ্গে ফোয়ারার আশপাশে বাতিসহ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়| একই সময়ে বন্দরবাজার এলাকায় নির্মিত করা হয় আরেকটি ফোয়ারা| এ ফোয়ারাগুলোর মধ্যে হুমায়ুন রশীদ চত্বর, কুমারপাড়া পয়েন্ট, শাহী ঈদগাহ পয়েন্ট, ঈদগাহের ভেতরে পুকুর ও বন্দরবাজার হকার্স পয়েন্টের ফোয়ারাগুলো জেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় নির্মিত হয়| সিটি করপোরেশনের বাস্তবায়নে নির্মিত হয় নাইওরপুল পয়েন্ট ফোয়ারা ও কিনব্রিজের নিচে সুরমা নদীর তীরের ফোয়ারা|
কুমারপাড়া পয়েন্ট, শাহী ঈদগাহ পয়েন্ট, ঈদগাহের ভেতরে পুকুর ও বন্দরবাজার হকার্স পয়েন্টের ফোয়ারাগুলোর অস্তিত্ব নেই| এর মধ্যে কুমারপাড়া পয়েন্ট ও শাহী ঈদগাহ পয়েন্টের ফোয়ারার স্থলে এখন চত্বর নির্মাণ করা হয়েছে| বাকিগুলোও আর চালু হয়নি|
জেলা পরিষদ নির্মিত পাঁচটি ফোয়ারা বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা| সিটি করপোরেশন দুটি ফোয়ারা নির্মাণে ব্যয় করে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা| নির্মাণের পর কয়েক দিন সচল থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অযত্ন আর অবহেলায় কিছুদিন পরই অচল হয়ে পড়ে সবগুলো ফোয়ারা| এ সময় কিছু ফোয়ারার যন্ত্রপাতিও চুরি হয়ে যায়| আগাছা ও শ্যাওলা জমে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয় ফোয়ারাগুলো|
সিলেটের প্রবেশমুখে নগরের হুমায়ুন রশীদ চত্বরে ২০০৩ সালের ২৩ জুন একটি দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারার উদ্বোধন করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান| পরে সেটি নষ্ট হলে দুই দফা মেরামত করা হয়| এটি প্রায় একযুগ ধরে বিকল|
শুধু হুমায়ুন রশীদ চত্বরই নয়, নগরের কিনব্রিজের উত্তর পাশে সুরমা নদীর পাড়ে সার্কিট হাউসের বিপরীতের ফোয়ারাটি প্রায় ১২ বছর এবং নাইওরপুল এলাকার ফোয়ারাটি প্রায় ৬ বছর ধরে বিকল| স্থানীয়রা বলছেন, তিনটি ফোয়ারাই এখন পরিত্যক্ত|
সরেজমিনে নগরের হুমায়ুন রশীদ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, এখানে নির্মিত ফোয়ারাটি বিকল হয়ে পড়ে আছে| চুরি গেছে যন্ত্রপাতি| ফোয়ারা ঘিরে লাগানো ফুলগাছগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে| পুরো চত্বরটি ঢেকে ফেলা হয়েছে ব্যানার-ফেস্টুন আর বিলবোর্ডে| বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নামের ব্যানার ফেস্টুন লাগানো রয়েছে চত্বরের সর্বত্র| প্রায় একই দশা নগরীর বাকি ফোয়ারাগুলোর| সার্কিট হাউজের সামনের ফোয়ারা এখন নদী তীরে বেড়াতে আসা মানুষের বসার স্থানে পরিণত হয়েছে| ফোয়ারার ভিতরে চিপস, কোল্ড ড্রিংস ও প্লাস্টিকের চায়ের কাপের স্তুপ| জমে আছে বৃষ্টির পানি| যেখানে মশামাছি বংশ বিস্তার করছে|
নাইওরপুল ফোয়ারাতেও পানি নেই| ভেতরের যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়েছে| কিনব্রিজ এলাকার ফোয়ারাটিও বিবর্ণ হয়ে আছে| সেখানে নেই পানি ছিটানোর কোনো যন্ত্রাংশ|
নগরের তোপখানা এলাকার বাসিন্দা সাগর দাশ (৩২) বলেন, ‘সুরমাপারের এ ফোয়ারাটি কবে সর্বশেষ চালু হয়েছিল তা আমরা ভুলে গেছি| পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত সিলেটের সৌন্দর্য্যবর্ধনে এমন অবহেলা সত্যি দুঃখজনক| সিলেটের কয়েকটি ঐতিহ্যের স্মারক এই সুরমারপার| এখানে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে| ফোয়ারাটি চালু থাকলে এই স্থানের সৌন্দর্য্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ হতো|’
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ জানায়, ফোয়ারাগুলো নষ্ট হলে কয়েক দফায় মেরামত করা হয়েছিল| কিন্তু পরে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে অনেক যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে|
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর বলেন, ‘বিকল ফোয়ারা কয়েক দফা মেরামত করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যায়| নগরের নাইওরপুলে অবস্থিত ফোয়ারাটি ব্যাংক এশিয়ার দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে| আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি তারা খুব শীঘ্রই মেরামত করে ফোয়ারাটি চালু করবে| এছাড়া, হুমায়ুন রশীদ চত্বরটি নতুন নকশায় পুননির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে| বাকী ফোয়ারাগুলোও পর্যায়ক্রমে চালু হবে| তবে নগরের সৌন্দর্য্যবর্ধনে ফোয়ারাগুলো রক্ষণাবেক্ষণে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরকিদেরও সচেতন হতে হবে|’
এ বিষয়ে জেলা পরিষদ সিলেটের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের উদ্যোগে সিলেটে বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়| যার মধ্যে জেলা পরিষদ সিলেট কয়েকটি প্রকল্প অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন করে| নগরের সৌন্দর্য্যবর্ধনে কয়েকটি ফোয়ারা নির্মাণ করা হয় এবং তা সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়| এটা দেখাশোনা রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের| রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফোয়ারাগুলো বন্ধ ও ভেঙে ফেলা কোনোভাবেই যৌক্তিক না| আমরা এ বিষয়ে কথাবলবো|




