জামায়াতের ৮ লাখ ৩৯ হাজার কোটির ‘ছায়া বাজেট’
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ জুন ২০২৬, ৭:২০:৫৭ অপরাহ্ন
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৬৫ হাজার কোটি
জনপ্রশাসন, ঋণ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার
২০ কোটি মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় এই প্রস্তাবনা : জামায়াত আমীর
জালালাবাদ রিপোর্ট : প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি জাতীয় বিকল্প বা ছায়া বাজেট পেশ করেছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে এ ছায়া বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের পক্ষ থেকে জনমুখী বাজেট প্রস্তাবনা শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ বাজেট উপস্থাপন করা হয়। দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান মিলন বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে তিনি সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় অভিসিক্ত আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরেন।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সহ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শুভেচ্ছা বক্তব্যও রাখেন জামায়াত আমীর।
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ টাকা। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২.৪৩ শতাংশ।
বাজেটের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ০৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে। টাকার অঙ্কে যা ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে প্রস্তাব করেছে দলটি। এর পরিমাণ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ বরাদ্দের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের এই বাজেটে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং তৃণমূলের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
অন্যান্য খাতের মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ১০ শতাংশ এবং দেশের শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরে সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, জাতীয় সংসদের বিরোধীদল হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত জাতির সামনে একটি বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে (২০২৪-২৫) আমাদের জিডিপির আকার ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি (৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিশন হচ্ছে ২০৪৫ এর মধ্যে আমাদের অর্থনীতির আকার দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে নিয়ে যাওয়া। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। আমরা বাংলাদেশকে ঈমান, ইনসাফ ও সমতার ওপর ভিত্তি করে একটি সমৃদ্ধ ও সচল অর্থনীতির দেশে রূপান্তর করতে চাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বাজেট দর্শন সংগঠনটির বৃহত্তর অর্থনৈতিক দর্শন থেকে উৎসারিত। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশকে সাম্য, ন্যায়বিচার, ও মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত একটি আধুনিক ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বাজেট প্রস্তাবে এমপি মিলন বলেন, বর্তমানে মোট ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারধারীর (টিআইএন) সংখ্যা মাত্র ১ কোটি ২০ লক্ষ, যার মধ্যে বর্তমান কর বছরে জমা দেয়া রিটার্নের সংখ্যা ৪০ লক্ষেরও কম। আমরা করজাল সম্প্রসারণ করার ব্যাপারে উদ্যোগী। তাছাড়া উদ্যোক্তা সৃষ্টি, এসএমই খাতকে সমৃদ্ধ করা ও জীবনমান উন্নতির লক্ষ্য সর্বনিম্ন করযোগ্য আয়ের সীমা ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা এবং পরবর্তী অর্থবছরে তা ৫ লক্ষ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি।
যা বললের জামায়াত আমীর :
বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপনের আগে শুভেচ্ছা বক্তব্যে জামায়াত আমীর ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা দেশকে ভালোবাসি বলেই জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের আলোকে কেমন বাজেট হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা জনগণের সামনে তুলে ধরছি। এটি কোনো চূড়ান্ত বাজেট নয়, বরং বাজেটের পূর্বধারণা বা প্রস্তাবনা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন সমাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশা করে আসছে।
কিন্তু বারবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে জনগণ হতাশ হয়েছে এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশায় বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছে।
বাজেট প্রস্তাবনার লক্ষ্য সম্পর্কে জামায়াত আমীর বলেন, এটি কোনো দলীয় বাজেট নয়; দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনায় রেখেই প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। সরকার চাইলে এখান থেকে ইতিবাচক বিষয় গ্রহণ করতে পারে। তবে এর বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকিং খাত, বীমা ও বিভিন্ন কর্পোরেশনে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের কারণে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুঁজিবাজার সংকটে রয়েছে, আর ব্যাংকিং খাতও ঝুঁকির মুখে পড়লে দেশের অর্থনীতি আরও বড় বিপদের সম্মুখীন হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থবছর নির্ধারণ করা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাড়াহুড়া কমবে এবং বছরের শেষ দিকে এডিপি ব্যয়ের নামে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগও হ্রাস পাবে।
সম্পূরক বাজেট নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বছরের শেষ মুহূর্তে সম্পূরক বাজেট উপস্থাপন করলে সংসদীয় পর্যালোচনার কার্যকারিতা কমে যায়। বরং নিয়ম অনুযায়ী আগেই তা সংসদে আনা হলে জনগণের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।





